30 C
Dhaka

এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের নগরবাউল জেমস

প্রকাশিত:

আমি এখনও গান গাই, এলোমেলো সেই ঝাঁকড়া চুলে। দরাজ কণ্ঠে এমন কথার গানটি যিনি গেয়েছেন তার পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম। একটু খটকা লাগছে? যারা ফারুক মাহফুজ আনাম নামের সঙ্গে প‌রি‌চিত নন তাদের মনে খটকা লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাতীয় চল‌চ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত জীবন্ত কিংবদন্তী এই ব‌্যান্ড সংগীত তারকার ভক্তরা ঠিকই জানেন যে তি‌নি আর কেউ নন, তি‌নি হলেন তাদের চির প‌রি‌চিত এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের নগরবাউল জেমস। ভালোবেসে ভক্তরা তাকে গুরু নামেই ডাকেন।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও তুমুল জন‌প্রিয় রকস্টার‌ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নওগাঁর ছেলে ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতের কলকাতা, মুম্বাইসহ বিশ্বের বি‌ভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জেমসের অগ‌ণিত ভক্ত।তার পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম হলেও জেমস নামেই সবার কাছে বেশি পরিচিত তিনি।

বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম জেমস যে নক্ষত্র যুগের পর যুগ ধরে আলো বিলিয়ে চলেছেন, যে নক্ষত্র আজও দেদীপ্যমান। সুরের মায়াজালে তিনি নিজেকে পরিণত করেছেন জীবন্ত কিংবদন্তিতে। তার হাত ধরে গড়ে ওঠা নগরবাউল ব্যান্ডও তার মতোই সমান জনপ্রিয় শ্রোতাদের কাছে।

সুরের ভুবেনে দীর্ঘ পথচলায় শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গে‌ড়েছেন নগরবাউল জেমস। তার বাবা মোজাম্মেল হক ছিলেন সরকারী চাকরিজীবী। বাবার চাকরির কারণে দেশের নানা জেলায় শৈশব কেটেছে জেমসের। বহুবার রদবদল এসেছে স্কুল-কলেজে।

সবেমাত্র ক্লাস সেভেনে উঠেই গিটার নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয় জেমসের। আ‌শির দশকের শুরুর দিকেই ব্যান্ড সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। শুরুর দিকে বিভিন্ন ক্লাবে গান-বাজনা চলতো।

পড়ালেখায় খুব বেশি মনোযোগ ছিল না জেমসের। অথচ তার বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ। ঢাকা ‌শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও সেকেন্ডারি হায়ার এডুকেশনের ডিরেক্টর জেনারেল পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন জেমসের বাবা মোজাম্মেল হক। পড়ালেখার চেয়ে গানের দিকেই জেমসের বেশি ঝোঁক ছিল। ছেলের গানের ঝোঁক একদমই পছন্দ করতেন না মোজাম্মেল হক। গানের নেশায় কৈশোরেই পড়ালেখা ছাড়েন জেমস। শুধু তাই নয়, সুরের টানে ঘরও ছাড়েন তিনি। তখনও চট্টগ্রামে বাবা-মায়ের সঙ্গেই ছিলেন জেমস। কিন্তু বদলি হওয়ায় ঢাকায় চলে আসতে হয় জেমসের বাবাকে। বাবা-মা চট্টগ্রাম ছাড়লেও জেমস কিন্তু সেখানেই থেকে যান। পরবর্তী সময়ে জেমস সুরের ভুবনে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করলেও তার কিছুই দেখে যেতে পারেননি তার বাবা-মা।

আশির দশকের শেষদিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন জেমস। ঢাকায় আসার পর প্রকাশ করেন ‘স্টেশন রোড’ অ্যালবামটি। এর মধ্য দিয়ে পুরোদমে সুরের জগতে পথচলা শুরু হয় জেমস নামের এক স্ফুলিঙ্গের যা ধীরে ধীরে রীতিমতো দাবানলে পরিণত হয়।

আশির দশক থেকে গানের জগতে যাত্রা শুরু হলেও জেমস ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান নব্বইয়ের দশকে। তরুণ প্রজন্মের কাছে রীতিমতো ক্রেজে পরিণত হন এলোমেলো স্বভাবের এই খ্যাপাটে রকস্টার। তাকে ঘিরে রীতিমতো উন্মাদনা শুরু হয়ে যায় তার অগণিত ভক্তের মাঝে। কিন্তু তারকাখ্যাতি পাওয়ার জন্য কখনোই গান গাননি জেমস। তারকা হবেন- এমন প্রত্যাশাও তার ছিল না।

বাবা বদলি হয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে গেলেও জেমস থেকে যান তার প্রিয় শহর‌ চট্টলাতেই। আগ্রাবাদে পাঠানটুলীর আজিজ বোর্ডিংয়ে শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। আজিজ বোর্ডিংয়ের ১২ফুট/১২ ফুট দৈর্ঘ্যের ছোট্ট একটি ঘরে একটি ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটের সাম্রাজ্য নিয়ে থাকতে শুরু করেন জেমস। ছোট্ট সেই ঘরের ভেতরেই শুয়ে-বসে গান তুলতেন কণ্ঠে। আজিজ বোর্ডিংয়ের সামনেই ছিল ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্ট। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া সারতেন জেমস। সন্ধ্যা হলেই চলে যেতেন আগ্রাবাদ হোটেলে, শো করতেন নাইট ক্লাবে। শুরুতে ইংরেজি কভার মিউজিক করার পাশাপাশি বিভিন্ন নাইট ক্লাবে গিটার বাজাতেন। গানের টানে, প্রাণের টানে ঠাঁই নেন তিনি আজিজ বো‌র্ডিংয়ে। গান আর আড্ডা দিতে দিতে সেখানেই ভবিষ্যতের ভিতটা রচনা করে ফেলেন তিনি। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো তার স্মৃতির পাতা থেকে কখনোই মুছবার নয়।

আজিজ বোর্ডিংয়ের সংগ্রামী জীবন নিয়ে ‌‌‌’আমি তোমাদেরই লোক’ অ্যালবামে ‘আজিজ বোর্ডিং’ শিরোনামে গান গেয়েছেন জেমস। গানটির শুরুতেই তিনি স্মৃতি রোমন্থন করে ছোট্ট এক টুকরো বক্তব্যে বলেন, সেই আশির দশকের মাঝামাঝির কথা। গানের টানে, প্রাণের টানে আমি চট্টগ্রামে। ঠাঁই হলো আজিজ বোর্ডিংয়ে। গান বাঁধি, গান করি আর স্বপ্ন দেখি। সেই স্মৃতিময় আজিজ বোর্ডিং স্মরণে এই গান :
ছোট্ট একটি ঘর ছোট্ট একটি খাট
ছোট্ট একটি টেবিল একটি পানির জগ।
ছিল এক চিলতে আকাশ আমার
আর সেই প্রিয় গিটার
রুম নাম্বার ছ‌ত্রিশে ছিল আমার বসবাস।
প্রিয় আজিজ বোর্ডিং…
ছিল ব্যাচেলর সংসার আমার
ছিল অগোছাল জীবন আমার
রাত করে ঘরে ফেরার বাউন্ডুলে দিনভর।
কত স্বপ্নের পায়রা ছুঁয়ে গেছে মন
শত স্মৃতির কিংখাবে বন্দী সেদিন এখন।
ছিল গান আর গিটার আমার
ছিল স্ট্রাগল লাইফ আমার
ব্যান্ডের বন্ধুরা মিলে গীত রচনা
সেই নাইট ক্লাবে জিম মরিসন
বাজাতাম ডিলান বব মার্লে।

১৯৮৬ সালে প্রিয় চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে নিজের সৃষ্টিশীল কাজে ডুবে যান জেমস। সেসময় একবারের জন্যও ভাবেননি নিজের অজান্তেই দেশের ব্যান্ড সংগীত ইতিহাসের মহা তারকা হওয়ার পথে ছুটছেন তিনি। শুধুই গান করার জন্য গান করতেন তিনি। নিজের ভালোলাগা থেকে মেতে ওঠেন গান সৃষ্টিতে। সম্পূর্ণ স্বকীয় ধারায় স্বকীয় গায়কী ঢং‌য়ে স্বকীয় কণ্ঠে শ্রোতাদের উপহার দিতে থাকেন একের পর এক হৃদয়কাড়া সব গান। এভাবে জেমসের সংগীতে বিমো‌হিত হতে থাকেন শ্রোতারা। ধীরে ধীরে তার অগণিত ভক্ত জুটে যায়। জেমসের ভিন্নধারার গানে বিমোহিত হতে থাকেন তারা।

জেমস মনে করেন, তার ভিন্নধারার গান কিংবা গায়কী কোনোটাই সচেতনভাবে হয়‌নি। তার মতে, অতীত জীবনের সংগ্রাম, বাবার চাক‌রিসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়াঘু‌ড়ি আর ভেতরে জন্ম নেয়া অনুভূ‌তিগুলোই তার গানে গানে বিমূর্ত হয়ে ও‌ঠে।

ব‌লিউডে প্লেব‌্যাক জেমসের সংগীত জীবনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বলে মত দিয়েছেন জেমস নিজেই। প্রতিবেশী দেশটির শক্তিশালী চলচ্চিত্র মাধ্যমটিতে কাজ করে সম্পূর্ণ নতুন এক অ‌ভিজ্ঞতা স‌ঞ্চিত হয়েছে তার ঝুলিতে। ‌জেমস হিন্দি ভাষায় গান গেয়ে ব্যাপক সাফল‌্য পেলেও ভাষাটি তি‌নি নিজে ঠিকমতো বলতেও পারেন না। সব‌মি‌লিয়ে ব‌লিউডে যুক্ত হওয়াটা তার জন্য ছিলো একটা অ‌্যাড‌ভেঞ্চারের মতোই।

জেমস কখনোই অনেক বে‌শি ভেবে‌চিন্তে কাজ করার পক্ষপাতী নন। কোনো গান নিজের কাছে ভালো লাগলে কিংবা পছন্দ হয়ে গেলে সর্বোপরি গানটি নিয়ে তার ভেতরে তৃপ্তি‌বোধ কাজ করলেই হলো। সামনে-পেছনে চিন্তা না করে গানটি গেয়ে ফেলেন তি‌নি। গান উপহার দেয়াটাই তার মূল কাজ। পরবর্তী সব দায়-দা‌য়িত্ব তি‌নি তুলে দেন শ্রোতাদের হাতে।

শ্রোতারা জেমসের গান শোনেন, প্রতি‌ক্রিয়া দে‌ন। বে‌শিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ভালোবাসায় সিক্ত করেন জেমসকে। তার ভক্তরা শুধু গান শুনেই ক্ষান্ত হন না, গুরুকে অন্ধের মতো অনুসরণ ক‌রারও চেষ্টা করেন। গুরুর মতোই ঝাঁকড়া চুল রাখেন, হাতা গু‌টিয়ে পাঞ্জা‌বি কিংবা পা গু‌টি‌য়ে জিন্সের প‌্যান্ট পরেন, গলায় চাদর ঝোলান।

ভক্তদের এই অকৃত্রিম প্রেমই হলো জেমসের সৃ‌ষ্টিশীলতার মূল অনুপ্রেরণা। ভক্তদের এই অকৃ‌ত্রিম প্রেমই জেমসকে ধাবিত করে নতুন করে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠার জন্য, শ‌ক্তি জোগায় নতুন নতুন গান বাঁধার।

জেমস নিজেকে পুরোদস্তুর গানের মানুষ বলেই মা‌নেন। এই গান কারিগরের জীবনের অপ‌রিহার্য অংশ গানের চর্চা। রোজকার জীবনে খাবার গ্রহণ আর ঘুমের মতো গানের চর্চাও তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ব্যক্তি জেমসেই নন, তার অনেক সৃ‌ষ্টিই কালীক সীমারেখা অ‌তিক্রম করে‌ গেছে। জীবন্ত এই কিংবদন্তীর অনেক গানই অমর হয়ে থাকবে সংগীতের ই‌তিহাসের পাতায়। জীবদ্দশাতেই সংগীতের ই‌তিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে এই জাত‌ শিল্পীর নাম। বর্তমান প্রজন্মের মতো আগামী প্রজন্মও নিশ্চয়ই বুঁদ হবে জেমসের অসাধারণ গায়কী, বাণী ও সুরনির্ভর গানে।

জেমস ম‌নে করেন, কালজয়ী হওয়াটা ভীষণ ক‌ঠিন। তার জীবনে যে আকাশছোঁয়া সাফল‌্য আর প্রা‌প্তি এসেছে তা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। তার সব ভাবনা ভ‌বিষ‌্যৎ‌কেন্দ্রীক। গানের মাধ‌্যমেই অগ‌ণিত শ্রোতা আর ভক্তের প্রেমে সিক্ত হ‌য়েছেন জেমস। গানে গানে তাদের হৃদয় জ‌মিনে প্রবেশ করার পথটি তার নখদর্পণে। তাই গানের মধ্য দিয়ে কীভাবে মানু‌ষের হৃদমাঝারে চিরটাকাল বাস করবেন সেই ভাবনাতেই সদা ডুবে থাকেন গানের এই নিপুণ কা‌রিগর।

বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় হার্ড রক গান। দেশে এই গানের বিকাশ ও জনপ্রিয়তার পেছনে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে জেমসের। এছাড়া দেশে তিনিই প্রথম সাইকাডেলিক রক গান শ্রোতাদের উপহার দেন। এই হিসেবে দেশে সাইকাডেলিক রক গানের প্রবর্তক বলা যায় তাকে।

১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁ জেলায় জন্ম হয় জেমসের। তার বাবা মোজাম্মেল হক সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার চাক‌রিসূত্রে শৈশবে দেশের নানা অঞ্চলে ঘুরে বে‌ড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন জেমস। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটা সময়ে চট্টগ্রামের মা‌টিতে পা রাখেন জেমস। তার বাবা চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। তার বাবা চেয়ে‌ছিলেন ছেলে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় মানুষ হবে। কিন্তু ছেলের মাথায় তখদিনে ঢুকে গেছে গা‌ন পোকা। লেখাপড়ায় একটুও মন নেই। সারা‌দিন শুধু গান আর গান। জেমসের প‌রিবারের কেউই গানের সঙ্গে যুক্ত নন। তাই স্বভাবতই ছেলের গান পাগলামিকে মেনে নিতে পারেনি বাবা। শেষমেষ গানের টানে স্বেচ্ছায় বা‌ড়ি ছাড়েন জেমস। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন।

আ‌শির দশকের শুরুর দিকে চট্টগ্রামে ফিলিংস ব্যঅন্ডদল গড়ে তোলেন জেমস। সেসময় ব‌্যান্ড‌টির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্যাবলো (ভোকাল ও পিয়ানো), ফান্টি (ড্রামস) এবং স্বপন (বেজ গিটার)। শুরুর দিকে বব মা‌র্লে, জিম মরিসন, এরিক ক্ল‌্যাপটনের মতো বিখ্যাত শিল্পী‌দের ইং‌রে‌জি গান কভার করত ফি‌লিংস। একটা সময়ে স্বপন ও পাবলো ফিলিংস ছেড়ে দেন। এরপর আ‌শির দশকের মাঝামা‌ঝিতে ফান্টিকে নিয়ে জেমস চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। তখন ফিলিংস ব‌্যান্ডে যোগ দেন বেজ গিটা‌রিস্ট বাবু এবং কিবোর্ডিস্ট তানভীর।

ফিলিংস ব্যান্ডের প্রথম অ‌্যালবাম ‘স্টেশন রোড’ মু‌ক্তি পায় ১৯৮৭ সালে। অ‌্যালবা‌মটির পাঁচটি গান লেখেন জেমস নিজেই। গানের সুরগুলো অবশ্য মৌলিক নয়, বি‌ভিন্ন ইং‌রে‌জি গান থেকে ধার করা। ব‌্যবসা‌য়িকভা‌বে তেমন একটা সাফল‌্য পায়নি ‘স্টেশন রোড’। তবে অ্যালবামের কয়েক‌টি গান বেশ জনপ্রিয় হয়। ১৯৮৮ সালে সলো অ‌্যালবাম ‘অনন্যা’ ‌উপহার দেন জেমস। অ্যালবামটি সুপারহিট হয়, পায় তুমুল জনপ্রিয়তা। এরপর দুই বছর বির‌তি দেন জেমস। ১৯৯০ সালে বাজারে আসে ফিলিংস ব্যান্ডের সাড়াজাগানো অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’। অ‌্যালবামটি রীতিমতো হইচই ফেলে দেয় চারদিকে।

১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে জেমস ভালোবেসে ঘর বাঁধেন মডেল, আনন্দ বিচিত্রা ফটোসুন্দরী ও ‘অবুঝ মন’ ছবির না‌য়িকা রথিকে। প্রায় এক দশকের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে পরবর্তী সময়ে জেমস বিয়ে করেন হাঁটুর বয়সী প্রেমিকা বেনজির সাজ্জাদকে। বেনজিরের সাথে জেমসের প্রথম প‌রিচয় হয়ে‌ছিল একটি কনসার্টে। পরিচয় থেকে প্রেম, অতঃপর বিয়ে। ২০০২ সালে বেন‌জিরকে বিয়ে ক‌রায় জে‌লও খাটতে হ‌য় ‘জেল থেকে বলছি’ গানের কারিগর জেমসকে। তিন সন্তানের বাবা এই রক লিজেন্ড। ছেলের নাম দানেশ আর দুই মেয়ে জান্নাত ও জাহান।

নগরবাউল (১৯৯৬) , লেইস ফিতা লেইস (১৯৯৮) এবং কালেকশন অব ফিলিংস (১৯৯৯) অ্যালবামগুলো প্রকাশিত হয় ফিলিংস ব্যান্ড থেকে। পরবর্তী সময়ে ফি‌লিংস ব‌্যা‌ন্ডের নাম পাল্টে নগরবাউল রাখেন জেমস। এই ব‌্যা‌ন্ডের দু‌টি অ‌্যালবাম ‘দুষ্টু ছেলের দল’ ও ‘বিজলি’।

ব‌্যা‌ন্ডের পাশাপা‌শি ৮টি একক অ‌্যালবাম উপহার দিয়েছেন জেমস। তার একক অ‌্যালবামগু‌লো হলো: অনন্যা (১৯৮৮), পালাবি কোথায় (১৯৯৫), দুঃখিনী দুঃখ করোনা (১৯৯৭), ঠিক আছে বন্ধু (১৯৯৯), আমি তোমাদেরই লোক (২০০৩), জনতা এক্সপ্রেস (২০০৫), তুফান (২০০৬) ও কাল যমুনা (২০০৮)।

বাংলা চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েও ব্যাপক সাফল‌্য পেয়েছেন জেমস। সফল প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে স্বীকৃ‌তি মিলেছে জাতীয় পর্যায়েও। দুই বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঝুলিতে ভরেছেন তি‌নি। ২০১৪ সালে ‘দেশা- দ্য লিডার’ ছ‌বির ‘দেশা আসছে’ ও ২০১৭ সালে ‘সত্ত্বা’ ছবির ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ’ গানে কণ্ঠ দিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তি‌নি।

‘ওয়ার্নিং’ সিনেমার ‘এত কষ্ট কষ্ট লাগে’, ‘সুইটহার্ট’ সিনেমার ‘বিধাতা’, ‘লাল‌টিপ’ সিনেমার ‘ভোলা মনরে’, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’ সিনেমার ‘আসবার কালে আসলাম একা’, ‘মাটির ঠিকানা’ সিনেমার ‘মাটির ঠিকানা’ ও ‘জিরো ডিগ্রি’ সিনেমার ‘প্রেম ও ঘৃণা’ গানে জেমসের দরাজ কণ্ঠ প্রশং‌সিত হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

হি‌ন্দি চল‌চ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েও ব‌্যাপক জন‌প্রিয়তা পেয়ে‌ছেন জেমস। ব্যান্ড তারকা হিসেবে ভারতেও জনপ্রিয় এক নাম জেমস। ২০০৪ সালে ব‌লিউডের বিখ‌্যাত সংগীত পরিচালক বাঙা‌লি প্রীতম চক্রবর্তীর সঙ্গে জেমসের সাক্ষাৎ হয়। ২০০৫ সালে প্রীত‌মের সংগীত প‌রিচালনায় বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় প্লেব্যাক করে হইচই ফেলে দেন জেমস।

জেমসের গাওয়া ‘ভিগি ভিগি’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। বলিউডে প্লেব্যাক অভিষেকে দুর্দান্ত সাফল্যের পর ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে ‘ও লামহে’ সিনেমার ‘চল চলে’ ও ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ ছ‌বির ‘রিশতে এবং ‘আলবিদা (রিপ্রাইস)’ গানে কণ্ঠ দেন জেমস। কয়েকবছর বিরতির পর ২০১৩ সালে ‘ওয়ার্নিং থ্রিডি’ সিনেমায় ব‌লিউডের তুমুল জন‌প্রিয় সংগীত প‌রিচালকত্রয়ী মিট ব্রোস অঞ্জনসের সংগী‌ত প‌রিচালনায় ‘বেবাসি’ গা‌নে কণ্ঠ দিয়ে আবার মাত করেন জেমস।

জেমসের গাওয়া প্রতি‌টি হি‌ন্দি গানই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। তার দরাজ কণ্ঠে গাওয়া চমৎকার সুরেলা গান শুনে বিমোহিত হন বি-টাউনের বা‌সিন্দারা। ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ ছ‌বির ‘রিশতে’ গানে কণ্ঠ দেয়ার পাশাপা‌শি রকস্টার চরিত্রে গানের দৃশ্যে অভিনয়ও করেন জেমস। নিজের গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলান তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘ওয়ার্নিং’ ছ‌বি‌র ‘বেবাসি’ গানের ভিডিওতেও রকস্টার চরিত্রে অ‌ভিনয় করেন তিনি।

সফল গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও গিটারবাদক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও আ‌লোক‌চিত্রী হিসেবেও নিজেকে সফল প্রমাণ করেছেন জেমস। তার ভিন্ন ধরনের মডেল ফটোগ্রা‌ফি প্রশংসা কুড়িয়েছে বিভিন্ন মহলের। জয়া আহসান, মি‌থিলার মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের ছ‌বি তুলে বাজবা পেয়েছেন জেমস। মডেল ফটোগ্রা‌ফি ছাড়াও প্রকৃ‌তি ও নাগরিক জীবনকেও জেম‌স ক‌্যামেরাবন্দী করেছেন আনকোড়া নতুন আঙ্গিকে।

নিতান্তই শখের বসে ছবি তোলেন জেমস। তারপরও তার তোলা তোলা প্রাণবন্ত সেসব ছবি দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। দেশে কিংবা দেশের বাইরে যেখানেই যান ‌না কেন তার সঙ্গে থাকে ক্যামেরা। সাগরের ঢেউ থেকে শুরু করে জলের বুকে শহরের প্রতিচ্ছ‌বি, সূর্যাস্ত, ফুল, পাহাড়, বরফঘেরা পর্বতসহ নানা ধরনের নৈস‌র্গিক সৌন্দর্য ভিন্নভাবে বন্দী হয়েছে ক্যামেরায়। প্রায় সময়েই নিজের তোলা সেসব ছবি সোশ্যাল মি‌ডিয়ায় শেয়ার করে ভক্তদের চমকে দেন নগরবাউল জেমস।

লেখক : তানভীর খালেক

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ খবর

spot_img