20 C
Dhaka

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ

প্রকাশিত:

ফকির লালন শাহ।বাউল সম্রাট হিসেবে পুরিচিত মহান এই মর‌মি সাধকের জন্ম হয়ে‌ছিল ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালে ১১৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তার নশ্বর দেহ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তি‌নি অ‌বিনশ্বর হয়ে আছেন ও থাকবেন তার সৃ‌ষ্টির মধ্য দিয়ে।

লালনের অগণিত ভক্ত ও অনুসারী তাকে সাঁইজি বলে ডাকেন। তারা বিশ্বাস করেন, সাঁইজির দর্শন মেনে চলার মাধ্যমে আত্মার সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বস্তুবাদ নয়, ভাববাদের বাহক লালন দর্শন নিজের ভেতরে জন্ম নেয়া নানা প্রশ্নের উত্তর জানার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে, খুলে দেয় তৃতীয় নয়ন বা অন্ত‌রচক্ষু। ঈশ্বর ভাবনা, মানব জীবনের মহত্ব, মহাকালের রহস্যসহ আরও বহু প্রশ্নের উত্তর যে পথে আছে তার অনুসন্ধানই মানবজীবনকে মহান করে তোলে।

স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে আত্মিক সংযোগের কথা বলে গেছেন ফকির লালন শাহ। তার মতে, সব মানুষের দেহের মধ্যে একজন মনের মানুষের বসত রয়েছে। দেহের মধ্যে সদা বিদ্যমান থাকে সেই অচীন পা‌খি। কিন্তু অজ্ঞানতাবশত মানুষ সেই অচেনা সত্ত্বাকে চিনতে পারে না। অচীন সত্ত্বা‌টিকে চেনার তা‌গিদ দিয়ে‌ লালন শাহ বলেছেন, সেই অচেনাকে চেনার মধ্যেই নি‌হিত আছে সকল প্রা‌প্তি। আর সেই মনের মানুষ বা অচীন পা‌খির খোঁজ পাওয়া সম্ভব আত্মসাধনার মাধ্যমে।

লালন শাহ তার বিখ্যাত “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” গানের বাণীতে বলেছেন,

“খাঁচার ভিতর অচীন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার ওপরে সদর কোঠা আয়নামহল তায়।
কপালের ফ্যার নইলে কি আর পাখিটির এমন ব্যবহার
খাঁচা ভেঙ্গে পাখি আমার কোন বনে পালায়।
মন তুই রইলি খাঁচার আশে খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে ফকির লালন কেঁদে কয়।”

লালন শাহ শুধু একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধকই নন, তি‌নি একাধারে ক‌বি, জাত সংগীত‌শিল্পী, গান রচ‌য়িতা, বাউল দার্শনিক ও মানবতাবাদী সমাজ সংস্কারক। তাকে লালন শাহ ছাড়াও ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন ফ‌কির, মহাত্মা লালন নামেও ডাকা হয়।

উনিশ শতকে বাউল গানের তুমুল জন‌প্রিয়তার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূ‌মিকা রেখে‌ছে লালন সংগীত। ভারতের জা‌তির জনক, প্রভাবশালী রাজনী‌তি‌বিদ ও আধ্যাত্মিক নেতা মহাত্মা গান্ধীর ২৫ বছর আগেই মহাত্মা উপা‌ধি পেয়ে‌ছিলেন ফ‌কির লালন শাহ। পুরো ভারতবর্ষে ফ‌কির লালনই প্রথমবারের মতো মহাত্মা উপাধি পান।

লালন ফ‌কিরের মাধ্যমে বাউল গান বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে জন‌প্রিয়তা পেলেও লালন সংগীত আন্তর্জা‌তিক প‌রিমণ্ড‌লে প‌রি‌চি‌তি পায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। লালনের শতা‌ধিক গান সংগ্রহ করেছিলেন র‌বি ঠাকুর নিজেই। জমিদারি পরিচালনার জন্য রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ গেলে লালনের গানের সঙ্গে প্রথম প‌রি‌চিত হন। ‌

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩১৪ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত “গোরা” উপন্যাসে লালনের গান ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে একই প‌ত্রিকার হারমনি বিভাগে ১৩২২ বঙ্গাব্দে চারটি কিস্তিতে লালনের ২০টি গান ছাপার ব্যবস্থা করেন রবি ঠাকুর। লালনের “খাঁচার ভিতর অচীন পা‌খি” গানটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে আন্তর্জা‌তিক অঙ্গণে লালন ফ‌কির‌কে তুলে ধরে‌ছিলেন বিশ্বক‌বি নিজেই। মূলত এরপর থেকেই লালনকে নিয়ে চর্চা শুরু হয় আন্তর্জা‌তিক প‌রিমণ্ডলে। রবীন্দ্রনাথের ওপর বাউল গান যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে‌ছিল। এমন‌কি নিজেকে রবীন্দ্র-বাউল হিসেবেও পরিচয় দিতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও আগে লালনের গান প্রথম যার মাধ্যমে পরিচিতি পেয়ে‌ছিল তি‌নি হলেন লালনের ঘ‌নিষ্ঠ সহচর, বাউল শিল্পী, সাংবা‌দিক ও লেখক কাঙাল হরিনাথ। তার এমএন প্রেস থেকেই প্রথম মু‌দ্রিত হয়েছিল লালনের ২১‌টি গান।

ফ‌কির লালন শাহ অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলে গেছেন জীবনভর। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আশরাফ কিংবা আতরাফের মতো জাত বিভাজন মানতে নারাজ ছিলেন তি‌নি। লালন ফ‌কির তার অনেক গানের বাণীতেই অসাম্প্রদা‌য়িক চেতনার কথা সরাস‌রি তুলে ধরেছেন। যেমন লালন তার এক‌টি গানের বাণীতে বলেছেন,

“এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।
শোনায়ে লোভের বুলি নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি
ইতর আতরাফ বলি দূরে ঠেলে নাহি দেবে।
আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই সবার পাওনা পাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই ভবে কেহ নাহি পাবে।
ধর্ম কুল গোত্র জাতির তুলবে না গো কেহ জিগির
কেঁদে বলে লালন ফকির কেবা দেখায়ে দেবে।”

আরেক‌টি গানের বাণীতে লালন বলেন,
“জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সব দেখি তানা নানা।
যখন তুমি ভবে এলে তখন তুমি কী জাত ছিলে
যাবার বেলায় কী জাত নিলে এ কথাটি ভেবে বলো না।
ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, চামার, মুচি এক জলে সব হয়গো শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি, যমে তো কাউকে ছাড়বে না।
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয় এই ভ্রমও তো গেল না।”

ফ‌কির লালন শাহ তার গানের বাণীতে এমনও বলেছেন,

“সবে কি হবে ভবে ধর্মপরায়ণ
যার যা ধর্ম সেই সে করে, তোমার বলা অকারণ
কাঁটার মুখ কেউ চাঁছে না, ময়ূর চিত্র কেউ করে না
এমনি মতে সব ঘটনা যার যাতে আছে সৃজন
চিন্তামণি পদ্মিনী নারী এরাই পতিসেবার অধিকারী
হস্তিনী শঙ্খিনী নারী তারা কর্কশ ভাষায় কয় বচন
শশক পুরুষ সত্যবাদী, মৃগপুরুষ উর্ধ্বভেদী
অশ্ব বৃষ বেহুশ নিরবধি তাদের কুকর্মেতে সদাই মন।
ধর্ম কর্ম আপনার মন করে ধর্ম সব মোমিনগণ
লালন বলে ধর্মের করণ প্রাপ্তি হবে নিরঞ্জন।”

একেবারেই প্রচার‌বিমুখ ছিলেন লালন শাহ। শুধু শিষ্য ও ভক্তদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল লালনের গানের প্রচারণা। লালনকে নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য কাজ করেন বসন্তকুমার পাল। তি‌নি রচনা করেন প্রথম প্রামাণ্য লালন জীবনী। বসন্তকুমার পালের লেখা “মহাত্মা লালন ফকির” গ্রন্থে শুধু লালনের জীবনী নয়, বেশ কয়েক‌টি গান সংগ্রহের পাশাপা‌শি বিশ্লেষণও করা হয়েছে।

“মহাত্মা লালন ফকির” গ্রন্থে “আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে” গানটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভাবের কথা ছাড়িয়া দিয়া এই সংগীতটির শব্দবিন্যাস, হ্রস্ব ও দীর্ঘস্তরের সন্নিবেশ ও ছন্দজ্ঞানের পাণ্ডিত্য পরিষ্কার হৃদয়ঙ্গম করা যায় অথচ তিনি লেখাপড়া জানিতেন না। মানুষের মধ্যেই ভগবানের বিকাশ, এই দেহেই তিনি বিরাজিত, ইহার মধ্যেই তাঁহার বিলাস এবং এই মানবজগৎ লইয়াই যে তাঁহার লীলাখেলা এই কথাই তিনি পুনঃ পুনঃ আলোচনা করিয়া গিয়াছেন।

যতদূর জানা যায়, লালন ফ‌কির অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। কিন্তু তার গানের ভাষা থেকে শুরু করে শব্দ চয়ন, তত্ত্ব ও ভাব বিশ্লেষণ করলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। গানের ভাব উদয় হলে লালন শাহ তার ভক্তদের ডেকে বলতেন, “ওরে, তোরা কে কোথায় আছিস, আমার পোনা মাছের ঝাঁকেরা এসেছে।” তিনি একটার পর একটা গান গাইতেন আর ভক্তরা সেগুলো লিখে রাখতেন। সময়ের প‌রিক্রমায় লালনের অনেক গানই হারিয়ে গেছে। তারপরও টিকে আছে তার হাজার খানেক গান যা বাংলা লোক সংগী‌তের অমূল্য সম্পদ।

কুষ্টিয়া জেলার ছেউড়িয়ায় চির‌নিদ্রায় শা‌য়িত আছেন মহান সাধক লালন শাহ। সেখানে তার মাজারকে কেন্দ্র করে ১৯৭৬ সালে লালন একাডেমি স্থা‌পিত হয়। সেখানে আরও আছে আয়নামহল, লালন জাদুঘর ও লালন আশ্রম। দেশ-বি‌দে‌শের লালন ভক্তদের ভজন আর সাধনে এক আধ্যাত্মিক প‌রিবেশ সেখানে সদা‌ বিরাজমান।

বর্তমান যুগেও লালনের আদর্শ বিশ্বমানবতার শান্তির বাণী হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। দেশে-‌বিদেশে লালন দর্শন ও তার গানের মর্মবাণী উদ্ধারে নানা গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। লালনের মৃত্যুর শতবর্ষ পে‌রি‌য়ে গেলেও তার গা‌ন কিংবা দর্শনের আবেদন এতটুকুও ফুরায়‌নি। তার গানে আজও বিমো‌হিত হন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। লালনের গান ও দর্শনে প্রভা‌বিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলাম, অ্যালেন গিন্সবার্গসহ আরও অনেক বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষ।

লেখক : তানভীর খালেক, নিউজ এডিটর, প্রথম কাগজ

সম্পর্কিত সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img