23 C
Dhaka

রকস্টার জিম ম‌রিসন কি স‌ত্যিই বেঁচে আছেন! (ভিডিও)

প্রকাশিত:

বিশ্ব রক সংগীতের ইতিহাসে আজও উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে যার নাম উচ্চারিত হয় তিনি রকস্টার জিম মরিসন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি চিরতরে হারিয়ে গেলেও অগণিত ভক্তের হৃদয়ে চিরতরুণ হয়ে বেঁচে আছেন তিনি। আজও বহু তরুণের আদর্শ তিনি।

রকস্টার জিম মরিসনের রহস্যময় মৃত্যু ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ। ময়নাতদন্ত ছাড়াই মৃত্যুর দু‌দিন পর তড়িঘড়ি করে মাত্র কয়েকজন মানুষের উপস্থিতিতে কবর দেওয়া, মৃত্যুর মাত্র ৭ দিন আগে কবর কেনা, মৃত্যু সনদে অসঙ্গতি, মৃত্যুর পর দেখা যাওয়া ছাড়াও আরও কিছু কারণে বলা হয়ে থাকে, জিম মরিসন আসলে নিজেই নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়েছিলেন। খ্যাতির বিড়ম্বনা, আই‌নি ঝামেলাসহ নানা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এই তারকা গায়ক স্বেচ্ছায় নিজেকে আড়াল করেছেন নতুনভাবে বাঁচার আশায়। তিনি যদি সত্যিই বেঁচে থাকেন তবে এখন তার বয়স আশির কাছাকাছি।

জিম ম‌রিসনের জন্ম ১৯৪৩ সালে, মা‌র্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লো‌রিডায়। মাত্র পাঁচ বছরের সংগীত ক্যারিয়ারে ‘ব্রেক অন থ্রু টু দ্য আদার সাইড, সে‌লিব্রেশন অব দ্য লিজার্ড, এন্ড অব দ্য নাইট, দ্য ঘোস্ট সং, ই‌ন্ডিয়ান সামার, হ্যালো আই লাভ ইউ, এল. এ. ওম্যান, লাভ মি টু টাইমস, লাভ স্ট্রিট, লাইট মাই ফায়ার, হোয়েন দ্য মিউ‌জিক ইজ ওভার, হুই‌স্কি মি‌স্টিকস অ্যান্ড মেন, রাইডার্স অন দ্য স্টর্ম, সোল কিচেনসহ এমন সব অসাধারণ গান উপহার দিয়েছেন জিম ম‌রিসন যা শুনে আজও বিমো‌হিত হন অগ‌ণিত শ্রোতা। নিজের সৃ‌ষ্টির ম‌ধ্য দিয়ে অমর হয়ে আছেন মাত্র ২৭ বছর বয়সে চিরতরে হা‌রিয়ে যাওয়া ক্ষণজন্মা রক লিজেন্ড জিম ম‌রিসন।

বোহে‌মিয়ান জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই রক তারকার রহস্যজনক মৃত্যু হয় ১৯৭১ সালে, প্যারিসে। ১৯৭১ সালের ৩ জুলাই ভোর ৬টার দিকে প্যারিসে এক‌টি অ্যাপার্টমেন্টের বাথটাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। তার আক‌স্মিক মৃত্যুর বিষয়‌টি পুরো বিশ্বের কাছে গোপন রাখা হয়। ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে প্যারিসের পেরে লাচাইস সমা‌ধিস্থ‌লে সমা‌হিত করা হয় তুমুল জন‌প্রিয় এই রক তারকাকে। তার অগ‌ণিত ভক্তসহ বিশ্ববাসীকে না জা‌নিয়েই মাত্র পাঁচজন মানুষের উপ‌স্থি‌তিতে ছোট্ট প‌রিসরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাহিত করা হয় রক সংগীতের কিংবদন্তী জিম ম‌রিসনকে।

ময়নাতদন্ত না হওয়ায় জিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ চিরটাকাল রহস্যই রয়ে গেছে। অবশ্য সরকারিভাবে তার মৃত্যুকে হার্টফেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হার্টফেলের পেছনের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে মাত্রাতি‌রিক্ত মাদক সেব‌নকে।

জিম মরিসনের মৃত্যু ঘিরে রহস্য:

অনেকের মতেই রক লিজেন্ড জিম ম‌রিসনের মৃত্যুকে কোনোভাবেই স্বাভা‌বিক মৃত্যু বলা যাবে না। তারপরও কোনো রকম ময়নাতদন্ত ছাড়াই মৃত্যুর দু‌দিন পর মাত্র পাঁচজন মানুষের উপ‌স্থি‌তিতে গোপনে তাকে সমা‌হিত করা হয়। সরকা‌রিভাবে জি‌ম হার্টফেল করে মারা গেছেন বলা হলেও তার মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। একের পর এক সামনে আসতে থাকে নানা তত্ত্ব।

জিমের মৃত্যু সাজানো নাটক:

অনেকের মতে, জিম আদতে মারাই যান‌নি। খ্যাতির বিড়ম্বনা, আই‌নি ঝামেলাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই তারকা স্বেচ্ছায় নিজেকে আড়াল করেছেন নতুনভাবে বাঁচার আশায়। এজন্য প্যারিসে নিজের মৃত্যুর নাটক সা‌জান তি‌নি। এমন‌কি জিমের মৃত্যুর পর তার বন্ধু, সহপাঠী ও ডোরস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য রে মানজারেকও এই ই‌ঙ্গিত দিয়ে‌ছিলেন। জিমের সঙ্গে ১৯৭০ সালে এক‌টি আলাপের সূত্র ধরে মানজারেক জা‌নিয়েছিলেন, তার ধারণা জিম ম‌রিসন নিজের জীবনের সমস্যাগুলোকে পেছনে ফেলে নতুন এক‌টি জীবন শুরু করার জন্য ‌নিজের মৃত্যুর নাটক সা‌জিয়ে থাকতে পারেন।

জিমের নতুন প‌রিচয় কাউবয় উই‌লিয়াম লোয়ার:

ধারণা করা হয়, প্যারিসে নিজের মৃত্যুর নাটক মঞ্চায়ন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস শুরু করেন জিম ম‌রিসন। সেখানে ক‌বিতা লেখালে‌খি আর আবৃ‌ত্তিতে ডুবে যান তি‌নি। আবার এমন ধারণাও প্রচ‌লিত আছে যে, জিম ম‌রিসন নাম পাল্টে উই‌লিয়াম লোয়ার নামে কাউবয়ের জীবন বেছে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন রাজ্যে নতুন জীবন শুরু করেন। সত্তুরের দশকে ওরেগনে জিমের মতো একজনকে দেখাও গিয়ে‌ছিল। সেই ঘটনা উল্লেখপূর্বক ২০১৬ সালে অন্তর্জালে খবর চাউর হয়, জিম ম‌রিসন বেঁচে আছেন এবং ওরেগনে বহাল ত‌বিয়তেই আছেন। এ যেন ১৯৮৩ সালে মু‌ক্তি পাওয়া এ‌ডি অ্যান্ড দ্য ক্রুজারস ছ‌বির কা‌হি‌নি! কিন্তু রিল আর রিয়েল লাইফ কি এক হতে পারে? জিম ম‌রিসন কি স‌ত্যিই বেঁচে আছেন? জিমের বেঁচে থাকা নিয়ে প্রচ‌লিত ধারণা হলো, ‌তি‌নি এক‌টি গবা‌দি পশুর ফার্মে ঘোড়া লালন-পালন করে দিনযাপন করেন। ডোরস ব্যান্ডের সব সদস্যই বিষয়‌টি সম্পর্কে অবগত। তারা জানেন, জিম মারা যান‌নি। উই‌লিয়াম লোয়ার না‌ম ধারণ করে নতুন জীবন বেছে নিয়েছেন এবং জিমের এই নবজীবনকে তারা শ্রদ্ধা করেন। কাউবয় জিম খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করেন তার স্ত্রী এবং প‌রিবার নিয়ে। ২০১৩ সালে মারা গেছেন ডোরস ব্যান্ডের কিবোর্ডিস্ট রে মানজারেক। তার ভাই রিক মানজারেকের সঙ্গে খুবই ঘ‌নিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে উই‌লিয়াম লোয়ারের (‌জিম ম‌রিসন)। ডোরস ব্যান্ডের বাকী দুই সদস্য র‌বি ক্রিগার এবং জন ডেনমমোরও জানেন যে, জিম ম‌রিসন আসলে মারা যান‌নি। রকস্টার হিসেবে তুমুল জন‌প্রিয়তা পেলেও খ্যাতির কারণে কম ভোগা‌ন্তি পোহাতে হয়‌নি তাকে। এজন্য একটা পর্যায়ে সংগীত ক্যারিয়ার থেকে দূ‌রে সরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন জিম। সব ছেড়েছুড়ে নিজ দেশ থেকে বহু দূরে প্যারিসে গিয়ে ক‌বিতাচর্চায় মনো‌নিবেশ করেন।

রকস্টার জীবনের প্রতি ঘৃণা:

গুগল ঘাঁটলে জানা যায়, এফ‌বিআই ও পু‌লিশের সঙ্গে বড় ধরনের ঝামেলায় জ‌ড়িয়ে পড়ে‌ছিলেন জিম। কনসা‌র্টে জনসমক্ষে অশ্লীল অঙ্গভ‌ঙ্গির অ‌ভিযোগে ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ পান তি‌নি। এক পর্যায়ে রকস্টার জীবনের প্রতি তার ঘেন্না ধরে যায়। তাই প্যারিসে গিয়ে ক‌বিতা লেখায় মনো‌নিবেশ করেন তি‌নি।

ক‌ফিনের ভেতর জিম ছিলেন না:

আরেক‌টি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লম্বা সময় পার হলেও জিমের মৃত্যুর খবর মি‌ডিয়াকে জানানো হয়‌নি। শুধুমাত্র প্রেমিকা পামেলা কোর্সন ছাড়া জিমের মৃতদেহ তার কাছের মানুষ‌রা কখনোই দে‌খার সুযোগ পান‌নি। বলা হয়ে থাকে, দীর্ঘ সময় জিমের মরদেহ ড্রাই আইস দিয়ে প্যাকেট করে রাখা হয়ে‌ছিল। এরপর ক‌ফিনবন্দী জিমকে নিয়ে যাওয়া হয় সমা‌ধিস্থলে। ক‌ফিনে জিমের মৃতদেহ ঢোকানোর আগ পর্যন্ত একমাত্র সাক্ষী ছিলেন পামেলা। ক‌ফিনবন্দী হওয়ার পর পামেলা ছাড়া আর কেউই জিমের মুখ দেখতে পারেন‌নি। তাই নি‌শ্চিত করে বলা যায় না, ক‌ফিনের ভেতর আদৌ জিমের মরদেহ ছিল কিনা। জিমের মৃত্যুর খবর শু‌নে এই একই প্রশ্ন তোলেন ডোরস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য রে মানজারেক। তার কথায়, “এমন একজন মানুষই আছেন যি‌নি নিজের মৃত্যুর নাটক সাজাতে পারেন, ফরা‌সি চি‌কিৎসকদের কিছু অর্থ দিয়ে নকল মৃত্যু সনদ জোগাড় করতে পারেন, দেড়শো পাউন্ড ওজনের বালু ভরতে পারেন নিজের ক‌ফিনে, চলে যেতে পারেন পৃ‌থিবীর কোনো এক প্রান্তে আ‌ফ্রিকা ‌কিংবা কে জানে কোথায়! তি‌নি আর কেউ নন, জিম ম‌রিসন। একমাত্র তার পক্ষেই এমনটা করা সম্ভব।”

জিমের মৃত্যুর সন‌দপত্রে অসংগ‌তি:

জিমের লাশের কোনো ময়নাতদন্ত করা হয়‌নি। এমন‌কি তার মৃত্যুর সনদপত্র দিয়ে‌ছিলেন যে চি‌কিৎসক তার স্বাক্ষরও ছিল অস্পষ্ট। শুধু তাই নয়, শুরুতে জিমের মৃত্যু সনদে তার নাম উল্লেখ করা হ‌য় ডগলাস ম‌রিসন। কিন্তু পরে জেমস অংশ যুক্ত করা হয়। ডগলাস ম‌রিসন এবং জেমস- এই দু‌টি অং‌শের হাতের লেখায় তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। পরে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে জানান, জেমস অংশ‌টি জিম ম‌রিসনের নিজের হাতের লেখার সঙ্গে মিলে যায়।

মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে প্যারিসে কবর ক্রয়:

জিমের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এমন খবরও চাউর হয়েছে যে, মৃত্যুর মাত্র সাত‌দিন আগে না‌কি প্যারিসের এক‌টি কবরস্থানে কবর কিনে‌ছিলেন জিম ম‌রিসন। এমন‌কি মৃত্যুর তিন‌দিন আগে ওই কবরস্থানের আশপাশে হাঁটতেও দেখা গিয়ে‌ছিল তাকে।

মৃত্যুর পর ব্যাংক থেকে বিশাল অংকের অর্থ উত্তোলন করেন জিম:

মৃত্যুর এক‌দিন পর না‌কি জিম‌ ম‌রিসনকে প‌্যা‌রি‌সের এক‌টি এয়ারপোর্টে দেখা যায়। আর মৃত‌্যুর সপ্তাহখানেক পর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রা‌ন্সিসকোতে ব‌্যাংক অব আমে‌রিকা থেকে বিশাল অংকের অর্থ উ‌ত্তোলন করেন তি‌নি। ব্যাংকটির একজন কর্মচারী জানান, তি‌নি জিম ম‌রিসনকে চিনতেন বলে তার আই‌ডি দেখতে চান‌নি।

নিজের মৃত্যুর নাটক সাজানো ক‌বি র‍্যাঁবোর ভক্ত ছিলেন জিম:

বেঁচে থাকতে একা‌ধিকবার নিজের প‌রিচয় পাল্টে নতুন কোনো মানব রূপে পুনরায় হাজির হওয়ার ইচ্ছের কথা প্রকাশ করে‌ছি‌লেন জিম ম‌রিসন। ‌তি‌নি “মাতাল তরণী” বা “নরকে এক ঋতু”র মতো বিখ্যাত ক‌বিতার স্রষ্টা আর্থার র‍্যাঁবোর বিশাল ভক্ত ছিলেন। ফরা‌সি এই ক‌বি নিজের মৃত‌্যুর নাটক সা‌জিয়ে‌ছিলেন এবং আ‌ফ্রিকায় নতুন জীবন শুরু করে‌ছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‌নিজের কাব‌্য প্রতিভা দিয়ে প‌্যা‌রিসের ক‌বি সমাজে সম‌াদৃত হয়ে‌ছিলেন র‍্যাঁবো। কিন্তু তিন বছরের মাথায় সৃষ্টিশীল কাজ থেকে নিজেকে স‌রিয়ে নেন ২০ বছর বয়সী র‍্যাঁবো। লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে তিনি আরব এবং আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘু‌রি শুরু করেন। ম‌রণঘাতী ক‌্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়ে ১৮৯১ সালে তি‌নি মৃত‌্যুবরণ করেন। মৃত‌্যুকালে তার বয়স হয়ে‌ছিল মাত্র ৩৭ বছর।

জিমের মৃত্যু হয়ে‌ছিল প‌্যা‌রিসের এক‌টি নাইটক্লাবে:

জিমের মৃত‌্যুর ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালে সম্পূর্ণ নতুন এক তথ‌্য ফাঁস করে হইচই ফেলে দেন রক লেখক স‌্যাম বার্নেট। ‘দ‌্য এন্ড: জিম ম‌রিসন’ বইয়ে স‌্যাম উল্লেখ করেন, মাত্রা‌তি‌রিক্ত মাদক সেবনে জিম ম‌রিসনের মৃত‌্যু হয়ে‌ছিল প‌্যা‌রিসের রক এন রোল সার্কাস নামের এক‌টি নাইটক্লাবে। তখন ক্লাব‌টির ম‌্যানেজার ছিলেন স‌্যাম। ফরা‌সি ভাষায় লেখা বই‌টিতে স‌্যাম দা‌বি করেছেন, যে রাতে জিম ম‌রিসনের মৃত‌্যু হয় সেই রাতেই রক এন রোল সার্কাস ক্লাবে গিয়ে‌ছিলেন জিম। সেখা‌নে দুজন লো‌ক তার কাছে হেরোইন বি‌ক্রি করে। এর একটু পরই তি‌নি খেয়াল করেন, জিম উধাও। পরে একজন বাউন্সার ক্লাবের পুরুষ টয়লেটে ঝুঁকে থাকা অবস্থায় দেখতে পান জিমকে। তখন স‌্যাম তার এক ডাক্তার বন্ধুকে বলেন জিমকে পরীক্ষা করে দেখতে। সেসময় জিমের চেহারা ধূসর দেখা‌চ্ছিল, চোখগুলো বন্ধ ছিল, নাকের নিচে রক্ত ছিল, সামান‌্য ফাঁক করা মুখে এবং দাঁড়িতে সাদা ফেনা ছিল। তি‌নি শ্বাস নি‌চ্ছিলেন না। ডাক্তার বন্ধু‌টি জানায়, জিম মাত্রা‌তি‌রিক্ত মাদক সেবন করেছেন। তখন দুজন ড্রাগ ডিলার জোর দিয়ে বলেন, জিম মারা যান‌নি, অচেতন হয়ে পড়েছেন। এটা বলে তারা জিমকে ধরাধ‌রি করে এক‌টি ট‌্যা‌ক্সিতে উ‌ঠি‌য়ে তার অ‌্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যায়। জিমকে ফি‌রিয়ে আনার শেষ চেষ্টা হিসেবে তাকে গরম পা‌নিতে গোসল করানোর জন‌্য বাথটাবে নেওয়া হয়। কারণ ধারণা করা হয়, এই পদ্ধ‌তি অ‌তি‌রিক্ত মাত্রায় হেরোইন সেবনকারীকে পুনরুদ্ধারে সাহায‌্য করে। কিন্তু জিম মরিসনকে ফি‌রিয়ে আনার সব চেষ্টা ব‌্যর্থ হয়। স‌্যা‌মের ভাষ‌্য অনুযায়ী, তি‌নি ক্লাবের ভেতরেই জিমের ‌চি‌কিৎসার জন‌্য সাহায্যের আবেদন জা‌নিয়ে জরু‌রি স্বাস্থ‌্যসেবায় ফোন দিতে চেয়ে‌ছি‌লেন। কিন্তু ক্লা‌বের মা‌লিক তাকে নিষেধ করেন। স্ক‌্যান্ডালের ভয়ে ঘটনা‌টি প্রকাশ করতে চান‌নি মা‌লিক। স‌্যা‌মের কথায়, “আ‌মি জোরালো প্রতিবাদ জা‌নিয়ে‌ছিলাম। কিন্তু কিছুই করতে পা‌রি‌নি। কারণ তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। আর আ‌মি ক্লাবের মা‌লিক ছিলাম না।” ওই ঘটনার পর স‌্যাম ক্লাবের চাক‌রি ছেড়ে দেন। প‌রবর্তী সময়ে ডিজ‌নিল‌্যান্ড প‌্যা‌রি‌সের ভাইস প্রেসি‌ডেন্ট হন তি‌নি।

জিমের মৃত্যুর জন‌্য দায়ী ড্রাগ ডিলার জ‌্যঁ ‌ডি ব্রেটুইল:

২০১৪ সা‌লে ব্রিটিশ রক গা‌য়িকা মা‌রিয়ান ফেইথফুল দা‌বি করেন, তার প্রাক্তন ছেলেবন্ধু জ‌্যঁ ‌ডি ব্রেটুইল জিম ম‌রিসনের মৃত‌্যুর জন‌্য দায়ী। ব্রেটুইল ছিলেন একজন ড্রাগ ডিলার। নামী দামী তারকাদের কাছে মাদক সরবরাহ করতেন তি‌নি। তার কাছ থেকে নেওয়া মাদক সেবন করেই মারা যান জিম। মোজো ম‌্যাগা‌জিনে দেওয়া সাক্ষাৎকা‌রে ফেইথফুল বলেছিলেন, “সে (ব্রেটুইল) জিম ম‌রিসনের বাসায় যায় এবং তাকে হত‌্যা করে। সে জিমকে যে মাদক দেয় তা খুব বে‌শি শ‌ক্তিশালী ছিল। আর এ কারণেই জিম মারা যায়। তবে আ‌মি নি‌শ্চিত, এটা একটা দুর্ঘটনা ছিল।” উল্লেখ‌্য, জিমের মৃত‌্যুর পরের বছরই ১৯৭২ সালে মর‌ক্কোতে মৃত‌্যুবরণ করেন জ‌্যঁ ‌ডি ব্রেটুইল।

জায়ো‌নিস্টরা হত‌্যা করে জিমকে:

জিমের মৃত‌্যু নিয়ে এমন ধারণাও প্রচ‌লিত আছে যে, ইহুদি রাষ্ট্রকে রক্ষা ও রাষ্ট্রের আয়তন বাড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে যে জায়ো‌নিস্টরা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হত‌্যা করা হয়েছে জিম ম‌রিসনকে।

জিমের মৃত্যুর জন‌্য দায়ী সিআইএ এবং ফরা‌সি সিক্রেট সা‌র্ভিস:

এমনটাও বলা হয় যে, জিমকে হত‌্যা করার পেছনে ফরা‌সি সিক্রেট সা‌র্ভিসের হাত রয়েছে। এছাড়া ১৯৮৩ সালে ‌একজন ব্রিটিশ সাংবা‌দিক জিম ম‌রিস‌নকে হত‌্যার অ‌ভিযোগ তোলেন ইউএস সেন্ট্রাল ই‌ন্টি‌লিজেন্স এজে‌ন্সির (সিআইএ) বিরুদ্ধে। তার ভাষ‌্য অনুযায়ী, কাউন্টার কালচারের পুরোধা ব‌্যক্তি‌ত্বদের ‌নিঃ‌শেষ করে দেওয়ার চক্রান্তের বলী হয়েছেন জিম ম‌রিসন। উল্লেখ‌্য যে, ষাটের দশকে যুক্তরাজ‌্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কাউন্টার কালচার বা প্রতিসংস্কৃতি বিকশিত হয়। ষা‌ট থেকে মধ‌্য সত্তু‌র দশকে পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে পরে এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি ও সানফ্রান্সিসকো। ক্রমান্বয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলন বাড়তে থাকায় সামগ্রিকভাবে প্রতিসংস্কৃতি আন্দোলনটি যথেষ্ট বেগ পায়। পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনামে মার্কিন সরকারের ব্যাপক সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রী‌তিমতো বিপ্লব শুরু করেন আন্দোল‌নকারীরা। কাউন্টার কালচারের অন‌্যতম প্রভাবশালী ব‌্যক্তিত্ব হিসেবে উচ্চা‌রিত হয়েছে জিম ম‌রিসনের নাম। বরাবরই তি‌নি যুদ্ধের বিপ‌ক্ষে নিজের স্পষ্ট অবস্থানের কথা প্রকাশ করেছেন। এমন‌কি তার বাবা মা‌র্কিন নৌবা‌হিনীর কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন জিম। ত‌ার বাবার ইচ্ছে ছিল মা‌র্কিন সাম‌রিক বা‌হিনীতে যোগ দিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেন জিম। কিন্তু ‌তি‌নি রা‌জি হন‌নি। ই‌তিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রথাগত সংস্কৃ‌তির প‌রিবর্তনে নাটকীয় ভূ‌মিকা রাখতে পারে প্রতিসংস্কৃতি। তাই জিম ম‌রিসনকে মূ‌র্তিমান হুম‌কি হিসেবে মনে করতে থাকে সিআইএ এবং এফ‌বিআই এর মতো প্রভাবশালী মা‌র্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

রক দুনিয়ায় ষাটের দশকে ‌উন্মাদনার ঝড় তুলে‌ছিলেন রক লিজেন্ড জেমস ডগলাস ম‌রিসন যি‌নি জিম মরিসন নামেই বে‌শি প‌রি‌চিত। রক সংগীতের ই‌তিহাসে এক কিংবদন্তীর নাম জিম ম‌রিসন। তি‌নি ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার, কবি ও সুরস্রষ্টা। মা‌র্কিন মুলুকের তুমুল জন‌প্রিয় এই রকস্টার ছিলেন সাইকাডে‌লিক রক, ব্লুজ রক ও এ‌সিড রক ঘরানার বিখ্যাত ব্যান্ডদল ডোরসের মূল গায়ক।

বন্ধু-সহপাঠী অসাধারণ কিবোর্ড ও পিয়ানোবাদক রেমন্ড ড্যানিয়েল মানজারেক জুনিয়রকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৬৫ সালের জুলাই মাসে ডোরস ব্যান্ড গঠন করেন জিম ম‌রিসন। ডোরস ব্যান্ডের গিটা‌রিস্ট ও ড্রামার ছিলেন যথাক্রমে র‌বি ক্রিগার ও জন ডেনসমোর। রক এন রোল, জ্যাজ, ব্লুজ, ফোক ও ফ্লেমিংগো স্টাইলের সংমিশ্রণে তৈ‌রি ডোরস ব্যান্ডের অসাধারণ সব গান দারুণভাবে গ্রহণ করেন রক সংগীতপ্রেমী শ্রোতারা। আকাশছোঁয়া জন‌প্রিয়তা অর্জন করেন ডোর‌স ব্যান্ডের ভোকালিস্ট জিম ম‌রিসন। অসাধারণ বাণী‌ ও সুরনির্ভর কা‌ব্যিক গান, বিশুদ্ধ উচ্চারণ, দরাজ ক‌ণ্ঠ, নিজস্ব গায়কী ঢং ছাড়াও প্রাণবন্ত, উন্মত্ত ও বুনো মঞ্চ প‌রিবেশনায় জিম ম‌রিসন মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন অগ‌ণিত দর্শক আর শ্রোতাকে।

কৈশোরে পা দেয়ার আগেই কলম হাতে নিজস্ব সৃ‌ষ্টিশীল জগতে প্রবেশ করেন জিম ম‌রিসন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই ক‌বিতা লেখা শুরু করেন তি‌নি। লেখালে‌খির পাশাপা‌শি অ‌ভিনয় এমনকি চল‌চ্চিত্র প‌রিচালনাও করেছেন উচ্চ ডি‌গ্রিধারী ‌জিম ম‌রিসন। জর্জ ওয়াশিংটন হাইস্কুল থেকে স্নাতক ডি‌গ্রি অর্জনের পাশাপা‌শি ইউনিভা‌র্সিটি অব ক্যালিফো‌র্নিয়া, লস অ্যাঞ্জে‌লেস (ইউ‌‌সিএলএ) থেকে থিয়েটার আর্টস বিভাগে সিনেমাটোগ্রাফি বিষয়ে ডিপ্লোমাও করেন তি‌নি।

তিন‌টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পাশাপা‌শি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, একটি তথ্যচিত্র ও তিনটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেন জিম ম‌রিসন। তার প্রযো‌জিত ও প‌রিচা‌লিত ৫২ মি‌নিট ব্যাপ্তির নী‌রিক্ষাধর্মী স্বল্পদৈর্ঘ্য‌ চলচ্চিত্রের শিরোনাম ‘এইচডব্লিউওয়াই: অ্যান আমে‌রিকান প্যাস্ট্রল’। ১৯৬৯ সালে উত্তর আমে‌রিকার মোজা‌ভি মরুভূ‌মি ও লস অ্যাঞ্জেলেসে এর শু‌টিং হয়। মু‌ক্তি পায় পরের বছরের মার্চে। কা‌হি‌নি ও চিত্রনাট্য লেখার পাশাপা‌শি এতে অ‌ভিনয়ও করেন জিম। এছাড়া ফ্যাশন ফটোসেশনে অংশ নিয়ে দারুণ সব আলোক‌চিত্রে নিজে‌কে তুলে ধরে সবাইকে তাক লা‌গিয়ে দিয়েছেন দারুণ ফ্যাশন সচেতন এই তারকা।

জেমস ডগলাস ম‌রিসনের বাবা ছিলেন মা‌র্কিন নৌবা‌হিনীর রিয়ার অ্যাড‌মিরাল জর্জ স্টিফেন ম‌রিসন। শখের বসে পিয়ানো বাজাতেন এই সাম‌রিক কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন শহরে কেটেছে জিমের শৈশব। ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স এলিমেন্টারি স্কুলে প্রথম ভ‌র্তি হন তি‌নি। সেখানে থার্ড গ্রেড শেষ হওয়ার পর ভ‌র্তি হন টেক্সাসের একটি স্কুলে। কিছু‌দিন না যেতেই প‌রিবারের সঙ্গে চলে যেতে হয় নিউ মেক্সিকোতে। সেখানে কিছু‌দিন এক‌টি স্কুলে পড়ার পর ভ‌র্তি হন ক্যালিফোর্নিয়ার লংফেলো স্কুলে। শেষ করেন সিক্সথ গ্রেড। এরপর ভর্তি হন ভার্জিনিয়ার এলামেন্ডা হাইস্কুলে। পরে আরও দুইবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলাতে হয় তাকে। অবশেষে ১৯৬১ সালে ভার্জিনিয়ার জর্জ ওয়াশিংটন হাইস্কুল থেকে স্নাতক ডি‌গ্রি অর্জন করেন তি‌নি। মেধাবী ছাত্র ছিলেন জিম। ক্লাসের চেয়ে স্কুলের লাইব্রেরিতেই বেশি সময় কেটেছে তার। স্কুলজীবনেই ক‌বিতার প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মে তার। ১২ বছর বয়স থেকেই ক‌বিতা লেখা শুরু করেন। লেখ‌নির মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ প্রকাশের ভাষা রপ্ত করে ফেলেন তি‌নি। অনুধাবন করেন কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে নিজের না বলা কথা সবার সামনে তুলে ধরা যায়।

জিম ম‌রিসনের বাবা চেয়ে‌ছিলেন ছেলে তার মতো সাম‌রিক বা‌হিনীতে যোগ দি‌ক। কিন্তু বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে চাননি বলে সাম‌রিক বা‌হিনীতে যোগ দেননি জিম। তি‌নি বরাবরই ছিলেন যুদ্ধের ঘোর বিরোধী। সবসময় শা‌ন্তি আর ভালোবাসার জয়গান গেয়েছেন তি‌নি।

সাম‌রিক বা‌হিনীতে যোগ না দেওয়ায় ছেলের ওপর প্রচণ্ড নাখোশ হন স্টিফেন ম‌রিসন। তি‌নি ছেলের গানের প্রতি ঝোঁকের বিষয়‌টিকেও মেনে নিতে পারেন‌নি। এসব কারণে বাবা ও ছেলের ম‌ধ্যে দূরত্ব তৈ‌রি হয়। এক পর্যায়ে প‌রিবারের সবাইকে ছেড়ে নিজের মতো জীবনযাপন শুরু করেন জিম। শুরু হয় তার বোহে‌মিয়ান জীবন।

রক সংগীতের ই‌তিহাসে নতুন এক অধ‌্যায় রচনা করে‌ছি‌লেন জিম ম‌রিসন। প্রচণ্ড মদ্যপায়ী এই তারকা প্রায় সময়ই মাতাল অবস্থায় থাকতেন। এমন‌কি নেশায় ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় মঞ্চে উঠে নানা উদ্ভট কর্মকাণ্ড ঘটাতেন। মঞ্চে গান গাওয়ার সময় এমনও হয়েছে যে, নেশার ঘোরে গানের কথা বেমালুম ভুলে গি‌য়ে তৎক্ষণাত নতুন কথা জুড়ে দিয়ে গেয়ে উঠেছেন তি‌নি। কোকেন সেবনের জন‌্যও দুর্নাম ছিল তার।

এত‌কিছুর পরও জিম ম‌রিসনকে দেবতার সমতূল‌্য মনে করেন তার ভক্তরা। তার ব‌্যক্তিগত জীব‌নের নে‌তিবাচক দিকগুলো হেরে যায় তার অসাধারণ সৃ‌ষ্টিক‌র্ম ও সেগুলোর প্রকাশভঙ্গীর কাছে। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের গান আর গী‌তিক‌বিতা উপহার দিয়ে সংগীতকে এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়ে‌ গেছেন গুণী এই শিল্পী। স্বল্পব‌্যা‌প্তির জীবনে সংগীত ভুবনে যে অমূল‌্য রত্ন তি‌নি রেখে গেছেন তা কখনোই ভোলবার নয়। ‌বলাই বাহুল্য, বিশ্ব সংগীতের ই‌তিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ক্ষণজন্মা এই রক লিজেন্ডের নাম।

লেখক : তানভীর খালেক, নিউজ এডিটর, প্রথম কাগজ

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ খবর

spot_img