29 C
Dhaka

সংকটেও নতুন রূপে সাজছে সেন্টমার্টিন

প্রকাশিত:

লাল যেমন ভালোবাসা, তেমনি দ্রোহের প্রতীক। রয়েছে প্রত্যয় ও আবাহনের হাতছানি। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় ‘হৃদয় নিংড়ে লাল তরল’ ঢেলে দিয়েছিলেন। ভোরের জলরাশিতে ‘হঠাৎ উঠে আসা লাল সূর্যে’র সৌন্দর্য বিকশিত করেছে ভিন্ন আবহে। কবির চোখেই সমুদ্রকন্যা সেন্টমার্টিনের কাঠ-বাঁশের তৈরি কটেজের খোলা জানালায় অন্ধকার ভেদ করে পড়া সূর্যের আভাকে হৃদয়ে ধারণ করেন ষাটোর্ধ্ব মনতাজ উদ্দীন।

মার্চে তিনি প্রথম দ্বীপটিতে পা রাখেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপরূপ মহিমা অবলোকনেই কংক্রিটের ঢাকা ছাড়েন তিন দিনের জন্য। প্রকৃতির দৃশ্যে মনতাজের প্রশান্তির চোখও নীল জলের স্বর্গে পেয়েছে যাতায়াত, খাবারের উচ্চমূল্য, সুপেয় পানির অভাব, যত্রতত্র রিসোর্ট ও বিদ্যুৎ না থাকার ভোগান্তি। অবশ্য নানা সংকটের ভিড়েও নতুন আশা জাগিয়েছে বাঁশ-কাঠের তৈরি কটেজ ও রিসোর্ট।

মনতাজ বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রবাল আর নীল জলরাশির স্বর্গ- সব সময় শুনে এলেও দেখার সৌভাগ্য এবারই প্রথম। তবে অগাধ জলের সাগরেও খাবার পানির তীব্র কষ্ট পেয়েছি।

মাত্র ৮ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন দ্বীপ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়। সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননক্ষেত্র বলে পরিচিত এই দ্বীপে হরেক প্রজাতির প্রবাল, শৈবাল, কাঁকড়া, সামুদ্রিক মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি ও উদ্ভিদে রয়েছে পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহ। তবে এখানকার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে সঠিক পয়ঃনিস্কাশন বা ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্য সাগরে ফেলা হচ্ছে।

দূষিত হচ্ছে পানি। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ নাজমুল হুদা বলেন, নীতিমালার পরই সেন্টমার্টিনের ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

নভেম্বর থেকে আবারও পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে সেন্টমার্টিন। যাতায়াতের সমস্যা কাটাতে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে জেটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পরিষদ।

নতুন সাজ :গত বছর মার্চ থেকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মামুনুর রশিদের তত্ত্বাবধানে ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরীর বাস্তবায়নে গড়ে উঠেছে ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ ব্যবস্থাপনা ও সহায়তা কেন্দ্র’।

পারভেজ চৌধুরী সমকালকে বলেন, সৌন্দর্যপ্রেম মানুষের মজ্জাগত। মনের খোরাক মেটাতে এই দ্বীপে প্রতিদিন পর্যটক আসেন। তাঁরা যেন ভালোলাগা নিয়ে ফিরতে পারেন, সে জন্য কাজ করছি। দ্বীপ পরিচ্ছন্নে ছয় স্বেচ্ছাসেবক ও ১০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত আছেন।

সুপেয় পানির অভাব :’আঁরার চাইরো দাইক্যা পানি, তারপর-অ আঁরাত্তুন গম পানির অভাব। পুরা দ্বীপের মাইনসর জীবন ঘান নুনা পানিত শেষ অই যারগই’- হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন দ্বীপের ডেইলপাড়ার বাসিন্দা আছিয়া। তাঁর কথায় দ্বীপে সুপেয় পানির তীব্র অভাব স্পষ্ট। সরেজমিন দেখা যায়, দ্বীপের অনেক স্থানে গভীর নলকূপ থাকলেও পানি লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত। এ জন্য খাবার পানির জন্য আগতদের হাপিত্যেশ থেকেই যায়।

অবশ্য এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে বৃষ্টির পানি ধরে ব্যবহার দ্বীপটিতে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু তাতে আর কতজনের তৃষ্ণা মেটে? প্রকৃতিনির্ভর সমাধানই প্রয়োজন। এ জন্য সমুদ্রের পানি পরিশোধন পদ্ধতি ‘সি ওয়াটার রিভার্স ওসমোসিস প্ল্যান্ট’ (এসডব্লিউআরও)-এর কথা ভাবছেন সেন্টমার্টিনের ফ্যান্টাসি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী তোয়াহা মোহাম্মদ।

সমকালকে তিনি বলেন, দ্বীপে পানি সংকট তীব্র। সমাধানে নিজ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছি। এসডব্লিউআরও পদ্ধতিতে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সাগরের পানি বিশুদ্ধ করে কাঁচের বোতলে বাজারজাত করা হবে। এতে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে এবং দূষণ ঠেকানো যাবে।

আশ্রিতরা কষ্টে আছেন :খোলা দরজায় ঠেস দিয়ে একদৃষ্টিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব সখিনা বেগম। রাজ্যের উৎকণ্ঠা-অনিশ্চয়তা চেখে-মুখে। ১৯৯৪-এর ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারানোর স্মৃতি তাড়া করে ফেরে। কেমন আছেন- জিজ্ঞেস করতেই ভাবনায় ছেদ, মুখ না ফিরিয়েই আনমনে সখিনা বলে ওঠেন, ‘আর আমরার থাকা।’

এই প্রবাল দ্বীপে ব্যাপক পরির্বতন এলেও অধিকাংশ দ্বীপবাসীর জীবন মানের উন্নয়ন হয়নি। তার ওপর ধ্বংস হয়েছে প্রকৃতি। শুধু উন্নয়ন হয়েছে কিছু ব্যবসায়ীর। ১৯৯৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড জিঞ্জিরার সর্বস্বান্ত ৫০ পরিবারকে সেন্টমার্টিনের আশ্রয়কেন্দ্রে (ঘরে) জায়গা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে সেখানে ১৫০ পরিবার। তিন সদস্য নিয়ে সে সময় একটি ঘরে আশ্রয় পান সখিনাও। এত বছর পেরিয়ে গেলেও এসব ঘরের সংস্কার নেই, ভাঙাচোরা। সব মিলিয়ে কষ্টে আছেন আশ্রিতরা।

সেন্টমার্টিন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাজির হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রথম আশ্রয়কেন্দ্র অকেজো হয়ে গেছে। মানুষ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। মাছ শিকার করে খাবার জুটলেও আশ্রিতরা বঞ্চিত মৌলিক অধিকার থেকে। নেই চলাচলের রাস্তা, খাবারের নিশ্চয়তা।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ খবর

spot_img