20 C
Dhaka

সময়ের আগেই ‘অজানাতে’ হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পী হ্যাপী আখান্দ (ভিডিও)

প্রকাশিত:

‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে, যেখানে নদী এসে থেমে গেছে… আবার এলো যে সন্ধ্যা শুধু দুজনে’ কিংবা ‘কে বাঁশী বাজায় রে মন কেন নাচায় রে, আমার প্রাণ যে মানে না কিছুই ভালো লাগে না’ এর মতো শ্রু‌তিমধুর ও কালজয়ী গান গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে অমর হয়ে আছেন যে শিল্পী তার নাম হ্যাপী আখান্দ। ক্ষণজন্মা এই জাত শিল্পী না ফেরার দেশে যখন পা‌ড়ি জমান তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। বেঁচে থাকলে নিঃসন্দেহে বাংলা গান‌ আরও অনেক সমৃদ্ধ হতো তার মতো প্রতিভাবান শিল্পীর পরশ পাথরের ছোঁয়ায়।

মঞ্চে হ্যাপীর কণ্ঠে গান শু‌নে মুগ্ধ হয়ে জ‌ড়িয়ে ধরে‌ছি‌লেন ভারতের কিংবদন্তী সংগীত প‌রিচালক ও গায়ক রাহুল দেব বর্মণ। ওপার বাংলায় এক কনসার্টে অ‌তি‌থি হিসেবে হা‌জির ছিলেন আর ডি বর্মণ। বন্ধুর আমন্ত্রণে কনসার্টটি দেখতে গিয়েছিলেন হ্যাপী আখান্দ ও তার ভাই কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী লাকী আখান্দ।

একপর্যা‌য়ে হুট করেই মঞ্চে গান গাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন হ্যাপী। তার এমন বায়নায় হকচ‌কিয়ে যান আয়োজকরা। শুরুতে তারা আপ‌ত্তি তুললেও পরে অবশ্য সম্ম‌তি দেন। ভাই লাকীকে কী-‌বোর্ড বাজানোর দা‌য়িত্ব দিয়ে নিজে গিটার হাতে উঠে পড়েন মঞ্চে। এক‌টি গান গাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু উপ‌স্থিত দর্শক-‌শ্রোতাদের অনুরোধে একটার পর একটা গান গেয়ে সবাইকে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেন হ্যাপী। তার গাওয়া গানগুলোর মধ্যে আর ডি বর্মণের গানও ছিল। একে একে ১১‌টি গান গেয়ে মঞ্চ মা‌তিয়ে নামার পর তাকে জড়িয়ে ধরেন সংগীত ভুবনের কিংবদন্তী আর ডি বর্মণ।

হ্যাপীর প্রশংসা করেছিলেন সংগীত ভুবনের আরেক কিংবদন্তী মান্না দে। হ্যাপীর গাওয়া ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গা‌নটির রেকর্ড শু‌নে মুগ্ধতা চেপে রাখতে পারেন‌নি মান্না দে’র মতো গানের মহারথী। অচেনা হ্যাপীর গানের ক‌ণ্ঠ শুনে তার বড় ভাই লাকী আখান্দের কাছে মান্না দে জানতে চান, গান‌টি কে গেয়েছে? হ্যাপীর গানের কণ্ঠের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মান্না দে মন্তব্য করেছিলেন, হ্যাপী দারুন গান করেন, তার থ্রো‌য়িং চমৎকার।

হ্যাপী আখান্দের গাওয়া জন‌প্রিয় কিছু গানের মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি ঝর্না, স্বাধীনতা, এই পৃথিবীর বুকে আসে যারা, কে ওই যায়রে, নীল নীল শাড়ি পরে, খোলা আকাশ, তুমি কি দেখছ ইত্যাদি।

হ্যাপী প্রথম আলো‌চিত হন ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি গেয়ে। ১৯৭৫ সালে বিটিভিতে প্রথম তি‌নি গান‌টি প‌রিবেশন করেন। গানটির সংগীতায়োজন তার নিজেরই। গান‌টির সুরকার তারই বড় ভাই কিংবদন্তী সংগীত‌শিল্পী লাকী আখান্দ এবং গী‌তিকার এসএম হেদায়েত। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সালাহউ‌দ্দিন জাকী প‌রিচা‌লিত ‘ঘু‌ড্ডি’ ছ‌বিতে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গান‌টি ব্যবহৃত হলে তুমুল জন‌প্রিয়তা পায়। সময়ের কালীক সীমারেখা অ‌তিক্রম করা গান‌টি আজও সমান জন‌প্রিয়।

হ্যাপী আখান্দের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৩ সালের ১২ অক্টোবর, পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে। শৈশবেই গিটার, কীবোর্ডসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখা শুরু করেন হ্যাপী।

হ্যাপীর বড় ভাই দেশের আরেক কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী লাকী আখান্দ। ভাইয়ের হাত ধরে ১৯৭২ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে সংগীত ক্যারিয়ার শুরু হয় হ্যাপীর। সেই বছর স্পন্দন ব্যান্ডের কিবোর্ডবাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ফরিদ রশীদের সঙ্গে মিলে দেশের তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ডদল মাইলস প্রতিষ্ঠা করেন হ্যাপী আখান্দ।

১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে নিভে যায় সদা হাস্যোজ্জ্বল তরতাজা যুবক হ্যাপী আখান্দের জীবনপ্রদীপ। তিনি চলে গেলেও আজও চমৎকার কিছু গানের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন ক্ষণজন্মা এই শিল্পী। হয়তো এভাবেই তিনি গানে গানে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

লেখক : তানভীর খালেক, নিউজ এডিটর, প্রথম কাগজ

সম্পর্কিত সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img