20 C
Dhaka

সাতাশে নিভে যান কিংবদন্তী রকস্টার জিম মরিসন ও তার মহাজাগতিক সঙ্গী (ভিডিও)

প্রকাশিত:

পামেলা কোর্সন-জিম মরিসন সম্পর্ক:

কিংবদন্তী রকস্টার জিম মরিসনের রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে রয়েছে নানা তত্ব। বলা হয়ে থাকে, জিম মরিসন আসলে মারা যাননি। তিনি নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়েছিলেন। খ্যাতির বিড়ম্বনায় তিতিবিরক্ত এই রক তারকা সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এমনটা করেন।

মৃত্যুর সময় জিম মরিসনের সঙ্গে ছিলেন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী পামেলা সুজান কোর্সন যাকে সবসময় কসমিক মেট বা মহাজাগতিক সঙ্গী বলতেন জিম।

কাকতালীয় বিষয় হলো, জিমের মৃত্যুর মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে মাত্রাতিরিক্ত হেরোইন সেবনে পামেলা কোর্সনও মৃত্যুবরণ করেন। আরও অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, জিমের মতো পামেলারও মৃত্যু হয় মাত্র ২৭ বছর বয়সে।

জিমের চেয়ে বয়সে তিন বছরের ছোট পামেলার জন্ম হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। জিমের বাবার মতো পামেলার বাবাও ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। পামেলার বাবা কলম্বাস কর্কি কোর্সন ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার। পরে অবশ্য তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।

১৯৬৫ সালে জিমের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার লন্ডন ফগ নাইটক্লাবে প্রথম সাক্ষাৎ হয় পামেলার। প্রথম দর্শনেই পামেলার প্রতি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েন জিম। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বা প্রথম দর্মনেই পামেলার প্রেমে পড়ে যান জিম। পরবর্তী সময়ে জিম-পামেলার মধ্যে প্রগাঢ় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পামেলাকে উৎসর্গ করে দ্য ডোরস অ্যালবামের প্রথম গান :

১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় ডোরস ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম দ্য ডোরস। অ্যালবামের প্রথম গানটি জিম উৎসর্গ করেন তার প্রিয়তমা পামেলাকে। অ্যালবামটি প্রকাশের পর চারদিকে হইচই শুরু হয়ে যায়। অর্জন করে তুমুল জনপ্রিয়তা। সুপারহিট অ্যালবামটির কল্যাণে জিম প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক বনে যান। জিম তার প্রথম উপার্জনের পুরোটাই ব্যয় করেন প্রিয় প্রেমিকার পেছনে। শহরের কাছেই শান্ত ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে চমৎকার একটি বাসা ভাড়া নিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করেন জিম ও পামেলা। একবার তারা মরুভূমিতে গিয়ে বেশ কিছুদিন একসঙ্গে থাকেন। মরুভূমির মাঝে চাঁদের আলোতে প্রেয়শীকে নাচিয়েছিলেন জিম। আর প্রিয়তমার জন্য রচনা করেছিলেন দারুণ কিছু শ্লোক।

একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন না জিম-পামেলা:

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন না জিম ও পামেলা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি হতো। এমনকি তাদের ঝগড়া মেটাতে পুলিশে পর্যন্ত খবর দিতে হয়েছে প্রতিবেশীদের। তাদের ঝগড়া এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, চাকু নিয়ে ছোটাছুটির ঘটনাও ঘটেছে। গায়ে থুতু ছিটানো, জিনিসপত্র রাস্তায় ফেলে দেয়ার মতোও কাণ্ড ঘটেছে।

পামেলা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও জিমের কাছে কখনোই লুকানোর চেষ্টা করেননি। সঙ্গীর অবিশ্বস্ততায় বহুবার তীব্র যন্ত্রণা আর হাহাকারে বেদনায় নীল হয়েছেন জিম। এতকিছুর পরও তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়নি। ব্যাপক ঝগড়ার পর আবার মিলে যেতেন তারা, নতুন করে ভাসতেন প্রেমের জোয়ারে। জিমের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার সঙ্গেই ছিলেন পামেলা। তাদের মধ্যে বিয়ের আলাপ-আলোচনা হলেও জিমের অনিচ্ছার কারণে শেষ পর্যন্ত আর বিয়ের পথ মাড়ানো হয়নি তাদের।

৬ মাসের কারাদণ্ড পেয়ে পামেলাকে নিয়ে প্যারিসে উড়াল দেন জিম:

১৯৬৯ সালে মায়ামি কনসার্টের মঞ্চে দর্শকদের সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করার অভিযোগ ওঠে জিম মরিসনের বিরুদ্ধে। বলা হয়, তিনি নাকি তার যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করেছেন। ওই ঘটনায় মঞ্চে গান গাইতে গাইতেই গ্রেফতার হন পুলিশের হাতে। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক শোরগোল ওঠে চারদিকে।

কনসার্টে উপস্থিত একদল দর্শক বলেন, জিম যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু আরেকদল দর্শক এমনকি ডোরস ব্যান্ডের সদস্যরা দাবি করেন, জিম তার যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করেননি। দর্শকদের খেপানোর জন্য যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে উদ্যত হওয়ার ভান করছিলেন মাত্র। পরবর্তী সময়ে অবশ্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় জিমকে। সাজা হিসেবে ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ পান তিনি। তবে জেলের ঘানি টানতে হয়নি তাকে। ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। মদ্যপ বোকাসহ নানা কটুক্তি শুনতে হয় তাকে। তীব্র সমালোচনা শুরু হয় তাকে ঘিরে।

নানামুখী ঝামেলায় জড়িয়ে সংগীত ক্যারিয়ারের ওপর জিমের বিতৃষ্ণা ধরে যায়। সিদ্ধান্ত নেন দেশ ছাড়ার। মামলাসহ আরও নানা ঝামেলা থেকে দূরে গিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটানোর আশায় জিম ও পামেলা প্যারিসে উড়াল দেন ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ।

প্যারিসে পাড়ি জমানোর পর বান্ধবী পামেলা কোর্সনকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন জিম। তিনি একটি চারতলা অ্যাপার্টমেন্টে বান্ধবীকে নিয়ে থাকতেন। সেখানে জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করতে শুরু করেন এই প্রেমিক যুগল। কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাদের সম্পর্ক প্রেমময়তায় ভরে ওঠে।

জিম পরিবর্তনের কারণটি বুঝতে পারেন। পামেলা নিয়মিত নিজের শিরায় হেরোইন ইনজেকশন নিয়ে অনেক বেশি প্রেমময় হয়ে উঠেছিলেন। জিম নিজের শিরায় ইনজেকশন না নিলেও পাইপের সাহায্যে নাক দিয়ে কোকেন সেবন করতেন।

বাথটাবে পামেলাই প্রথম জিমকে মৃত দেখতে পান :

১৯৭১ সালের ২ জুন এই মাদকাসক্ত যুগলের অ্যাপার্টমেন্টে দুটি আলাদা ব্যাগে হেরোইন ও কোকেন পৌঁছে দেয় ড্রাগ ডিলার। পামেলার জন্য হেরোইন ও জিমের জন্য কোকেন ছিল ব্যাগগুলোতে। কিন্তু সম্ভবত ভুলবশত পাইপের মাধ্যমে নাক দিয়ে হেরোইন সেবন করে ফেলেন জিম। এতে করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পামেলা ডাক্তার ডাকতে চাইলেও বাধা দেন জিম।

সুস্থ বোধ করার জন্য তিনি বাথটাবে গোসল করতে যান। পামেলা ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর ৬টার দিকে তার ঘুম ভেঙে গেলে জিমকে বাথটাবে শোয়া অবস্থায় দেখতে পান। জিমের নিথর দেহ দেখে পামেলা প্রথমে মনে করেন মজা করছেন জিম। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাত জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য কল করেন।

চিকিৎসক এসে জিমকে মৃত ঘোষণা করেন। অ্যাপার্টমেন্টের বাথটাবে পামেলাই প্রথম জিমকে মৃত দেখতে পেয়েছিলেন। অনেকটা সময় কালক্ষেপণ করার পর পামেলা জানান, হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন জিম। কিন্তু ততক্ষণে জিমকে সমাহিত করা হয়ে গেছে। শুরুতে হার্ট অ্যাটাকে জিমের মৃত্যুর কথা বললেও পরবর্তী সময়ে আরও অনেক কাহিনি সামনে তুলে ধরেন পামেলা। কোনটি সত্যি আর কোনটি মিথ্যা তা তিনি ছাড়া আর কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কখনোই।

পামেলার বিরুদ্ধে জিমকে হত্যার অভিযোগ :

জিম মরিসনের মৃত্যুর খবর গোপন করা, ময়নাতদন্ত ছাড়াই জিমের মরদেহ সমাহিত করাসহ আনুষঙ্গিক আরও কিছু কারণে একটা সময়ে জিমকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তারই মহাজাগতিক সঙ্গী পামেলা কোর্সনের বিরুদ্ধে। এ কারণে বেশ কয়েক বছর গণমাধ্যম থেকে আড়ালে চলে যান পামেলা। তিনি অনেকটা স্বেচ্ছাবন্দী জীবন বেছে নেন নিজের জন্য।

পামেলাকে সব সম্পত্তি উইল করে দিয়ে যান জিম:

বেঁচে থাকতে পামেলাকে একটি বুটিক হাউজ কিনে দিয়েছিলেন জিম। সেই বুটিকের পেছনে নিজের মেধা ও শ্রম পুরোটাই ঢেলে দেন উদ্যোমী পামেলা। তিনি জোর প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি আনকোড়া সব পোশাক সংগ্রহের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। শুরুতে বুটিক হাউজটির নাম ঠিক করা হয়েছিল ফাকিং গ্রেট। কিন্তু পরে থেমিস নামটি চূড়ান্ত করেন পামেলা। এক পর্যায়ে ফ্যাশনেবল ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় থেমিস।

পামেলার বুটিক হাউজের দামী ও আনকোড়া ডিজাইনের সব পোশাক বিভিন্ন মহলের প্রশংসা কুড়ায়। তবে খুব বেশিদিন চলেনি সেই বুটিক হাউজ। ১৯৬৯ সালে যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সালে জিমের মৃত্যুর পর থেমে যায় থেমিস। জিম বরাবরই তার প্রিয়তমার পেছনে দেদারছে অর্থ ঢেলেছেন। এমনকি মৃত্যুর আগেই পামেলাকে নিজের সব সম্পত্তি উইল করে দিয়ে যান এই রকস্টার।

জিমের সম্পত্তির জন্য জিম ও পামেলার পরিবারের আইনি লড়াই:

মৃত্যুকালে আড়াই মিলিয়ন ডলার আর্থিক মূল্যমানের সম্পদ রেখে যান জিম। শুধু তাই নয়, তার মৃত্যুর ৫০ বছর পরও রয়্যালটি বাবদ কালজয়ী ব্যান্ড ডোরসের ঝুলিতে প্রতি বছর জমা হয় অন্তত দশ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থ চার ভাগে ভাগ হয়ে চলে যায় ব্যান্ডের চার সদস্যের কাছে। জিমের ভাগের অর্থ চলে যায় তার জীবিত আত্মীয়দের কাছে।

১৯৭৪ সালে মাত্রাতিরিক্ত হেরোইন সেবনে পামেলা মারা যাওয়ার বেশ কয়েক মাস পর সম্পদের উত্তরাধিকারত্ব পান তার অভিভাবকরা। জিম মরিসনের সঙ্গে যেহেতু পামেলার বিয়ে হয়নি তাই জিমের সম্পত্তির ভাগ পামেলার অভিভাবকদের দিতে অস্বীকৃতি জানায় জিমের পরিবার। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে আইনি লড়াইও হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে দুই পক্ষই জিম মরিসনের সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ সমান দুই ভাগে ভাগ করে নিতে সম্মত হয়।

লেখক : তানভীর খালেক, নিউজ এডিটর, প্রথম কাগজ

সম্পর্কিত সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img