28 C
Dhaka

সুরের সার‌থী ইউনুস আলী মোল্লা

প্রকাশিত:

বহু গুণী ব্যক্তির ভিড়ে অনেক মেধাবী মস্তিষ্ক আ‌ছে যারা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নিজের সোনালী সময়টুকু বিলিয়ে দিয়ে চলেছেন। যারা হয়তো দেশের প্রচলিত পরিমন্ডলকে মাড়াতে পারেননি, সনাতন নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হননি এবং যাদের মেধা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন বহু আলোচিত তারকা। বিশেষ করে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সঙ্গীত জগতের কথা না বললেই নয়। তেমনি একজন গুণী ব্যক্তিত্ব ইউনুস আলী মোল্লা। যিনি দেশের আলোচিত বহু সঙ্গীত শিল্পীর উত্থান এর জলন্ত সিঁড়ি হয়ে রয়েছেন।

ইউনুস আলী মোল্লা একাধারে একজন লেখক, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী এবং সঙ্গীত পরিচালক। বাংলাদেশ বেতারের বহু নিদর্শন তা প্রমাণ করেছে শ্রোতাদের মাঝে। নিজের লেখা গান, সুর এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তি‌নি তৈরি করেছেন আজকের অনেক জন নন্দিত শিল্পী। তার লেখা ও সুর করা বহু গান গে‌য়ে‌ছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বহু নামীদামি শিল্পী। সর্বোপ‌রি তিনি নিজেই একজন গুণী শিল্পী।

অনেক গান তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে গেয়েছেন নিজের লেখা ও সুরে।

বৃক্ষ যেমন ফল দিয়ে পরিচয় বহন করে, ঠিক তেমনি ইউনুস আলী মোল্লার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এপার বাংলা, ওপার বাংলা মিলিয়ে তার পদচারণা। সংগীত বিষয়ক ব্যাকরণিক লেখার ক্ষেত্রে রয়েছে তার দক্ষতা। তিনি একজন কণ্ঠযোদ্ধা। শত বিপদেও হাল ছাড়েননি। সংগীতকে আঁকড়ে ধরে লালন করে চলেছেন। সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ভালো একজন মানুষ।

সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তি‌নি তালিকাভুক্ত। কলকাতার অনেক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেছেন।ভারত থেকে বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আন্তর্জাতিক স্মারক গ্রন্থে তার লেখা ছাপা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি হতে গুণীজন সম্মাননা পেয়েছেন ২০১৫ সালে।

সঙ্গীতাঙ্গ‌ণের উচ্চপদস্থ মহলের উ‌চিৎ জীবন্ত কিংবদন্তি এই শিল্পীর যথাযথ মূল্যায়ন করা, পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করা। মৃত্যুর পরে সন্মান দান সে তো অনেকেই করে। বেঁচে থাকতে মূল্যায়িত হলে শিল্পী ধন্য হয়।

পাইলে রতন করিনা যতন হারায়ে খুঁজি তারে, গুণীর কদর করে যে জন খুঁজিয়া ফিরে সে দ্বারে দ্বারে।

সংগীতের সাথে জড়িত শিল্পীকে যথাযথ সম্মানে সম্মানিত করাটাও একটা শিল্প। শিল্পীরা সারাজীবন শুধু দিয়েই যায়। তারা পাওয়ার আশায় কিছু ক‌রে না। সৃ‌ষ্টিশীল কাজের বি‌নিময়ে শিল্পীদের প্রাপ‌্য নি‌শ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের অন‌্যতম গুরু দা‌য়িত্ব।

নদীর নাম চিত্রা, এ নদীর পশ্চিম তীরে উত্তর-দক্ষিণ লম্বালম্বি একটা গ্রাম জালালপুর। বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এ গ্রামের বাজারের পশ্চিম দিকে রক্ষণশীল পরিবার মোল্লাপাড়া। শমসদ্দী মোল্লা ছিলেন তেজী ও বৃদ্ধিশীল ব্যক্তি। তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সময় কবিতা লিখেছেন। তাঁরই দুই পুত্র গোলাম আলী মোল্লা ও আখের আলী মোল্লা।

কৃষি পরিবারে বসবাস ছিল। জমাজমি চাষাবাদ করতো কাজের লোকে। আটচালা বৈঠকখানা হুকা-গড়গড়ার ধুঁয়াতে ভরে যেত সন্ধ্যে বেলা পুঁথিপাঠ ও সাহিত্যের আসরে। অষ্টম শ্রেণী পাস গোলাম আলী মোল্লার পরিবারে কন্যা রাবিয়া খাতুন, পুত্র আব্দুর রউফ মোল্লা ও ছোটপুত্র ইউনুস আলী মোল্লা। রাবিয়া খাতুনের বিবাহ হয় ১৯৬২ সালে।

আব্দুর রউফ মোল্লা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় মাস্টার ডিগ্রি গ্রহন করেন ১৯৭৬ সালে। ইউনুস আলী মোল্লা ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহন করেন। নিজ গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুল থেকে ১৯৭০ সালে এসএসসি পাশ করেন।

কোটচাঁদপুর কে এম এইচ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন ১৯৭২ সালে। ঝিনাইদহ কে,সি কলেজ থেকে দুইবার ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেন কিন্তু আদুভাইয়ের দলেই থেকে যান। শিশুকাল থেকেই সংগীতের সুর, গল্প, কবিতা, যাত্রাগান তাকে আকৃষ্ট করে।

স্কুলে পড়াকালীন সময়ে গ্রামের উস্তাদ দুলাল চন্দ্র পালের কাছে সারগামের তালিম গ্রহন করেন। পরবর্তীতে শাহজাহান কবির, অজয় কুমার দাস ও বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের নিকট তালিম নেন। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে সংগীতের ব্যাকরণগত বিষয়ে তালিম গ্রহন করেন।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করে প্রশংসা পান এবং চলতে থাকে সংগীত পাঠের অনুশীলন। মফিজউদ্দিন মাঝি নামের একজন যার বাড়ী ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার প্রাণীমন্ডল গ্রামে। তিনি থালা বাসন বিক্রির সুত্রে এসেছিলেন জালালপুর গ্রামে । তিনি দোতারা আর মন্দিরা বাদ্যের সাথে প্রতি রাতেই আসর জমাতেন বৈঠকখানায়। তাঁর কাছে খালেক দেওয়ান, মালেক দেওয়ান, হাছন রাজার গান, মাইজ ভান্ডারী গানের কলাকৌশল শিখেছেন ইউনুস আলি মোল্লা।

আধুনিক গান শেখার টানে মাঝে মাঝে গান শিখতে যেতেন তখনকার বেতার শিল্পী জনাব শাহজাহান কবীরের কাছে। সেখান থেকেই বেতারে গান গাইবার আগ্রহ জাগে।

১৯৭৮ সালে রাজশাহী বেতারে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দেন। বেতারের উপযোগী পরিপক্ক কন্ঠস্বর না হওয়ায় শিশুশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৭০ সালে এসএসসি পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হন। তারপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ছিল। জুলাই মাসে ঝিনাইদহ শহরে ফুফুর বাড়ীতে বেড়াতে গেলে পাকিস্তা‌নি হানাদার বাহিনী পোস্ট অফিস মোড় থেকে তা‌কে তুলে নিয়ে যায়। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ক্যাম্পে নিয়ে লেবারের কাজ করাতে থা‌কে তা‌কে দি‌য়ে। অমানবিক আচরণ, নির্যাতনের তিন মাস পর মুষলধারে বৃষ্টিঝরা এক রাতে চুপি চুপি পালিয়ে এসে প্রাণে বেঁচে যান। তারপর গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান নেন। কিন্তু সেখা‌নে নিজেকে নিরাপদ নয় ভেবে ভারতের নদীয়া জেলার পূর্বনগর গ্রামে চলে যান।

কিছুদিন থাকার পর আবার ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় হলো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ। সবই ছিল এলোমেলো। নিজেদের জমিতে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। বড় ভাই তখন বিএ ৩য় বর্ষে পড়তেন। বৃদ্ধ পিতার ইচ্ছা সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবেন। অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে লেখাপড়া আর গান শেখার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

এসএসসি পাশ করে এইচএসসি ভর্তির সময় মায়ের অসুস্থতার কারণে তার পিতা ছোট ছেলে ইউনুস আলী মোল্লাকে বিয়ে দেন। কোটচাঁদপুরের খ্যাতনামা ডাক্তার আবুল কাশেমের বড় কন্যা আনজিরা বেগমের সাথে। বছর না যেতেই পিতার মৃত্যু হয়। সংসার জমা জমি বড় ভাইয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার খরচ যোগাতে দারুণভাবে অর্থ কষ্টে দিন যাপন করতে হয়। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি।

বড় ভাই আব্দুর রউফ মোল্লা (সদ্য প্রায়াত) মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে চাকুরী নিয়েছিলেন। কিন্তু চাকুরী মনোপুতো না হওয়ায় চাকুরী ছেড়ে মাধ্যমিক স্কুলের চাকুরীতে যোগদান করেন। ইউনুস আলী মোল্লা সংগীতকে তখনো আঁকড়ে ধরে ছিলেন। নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যেতেন। তারপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে চাকুরী প্রাপ্ত হন। এরই মধ্যে ১৯৮১ সালে খুলনা বেতারে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দিয়ে সংগীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। নিয়মিতভাবে বেতারে পল্লীগীতি পরিবেশন করে শ্রোতাপ্রিয় হন। চাকুরীর বদলীর জন্য তিনি সাতক্ষীরা থাকেন দুই বছর।

সাতক্ষীরার সংগীতাঙ্গনের কয়েক জনের সাথে নিবিড়ভাবে মিলিত হন। আমজাদ হোসেন, রোজবাবুর সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে। এসময় অনিমা অধিকারী, ইউনুস আলী মোল্লার কা‌ছে পল্লীগীতির তালিম নিয়ে খুলনা বেতারে তালিকাভুক্ত হন। আবার বদলী হয়ে চলে আসেন ঝিনাইদহে।

একটু পিছনের কথা- চাকুরী প্রাপ্তির পর গ্রামের কিছু জমি বিক্রি করে কোটচাঁদপুর উপজেলা শহরে জমি ক্রয় করে বসত করতে থাকেন। সে কারণে নিজ বাড়ী থেকেই প্রতিদিন যাতায়াত করতেন ঝিনাইদহে।

প্রতিদিন অফিস শেষে কালীগঞ্জের প্রীতি বিশ্বাসকে গানের তালিম দিতে থাকেন। এরই ফাঁকে ঝিনাইদহের তৌহিদা আক্তার রাত্রী ও প্রীতিলতা বিশ্বাসকেও তালিম দিতে থাকেেন। কিছুদিন পরে প্রীতি বিশ্বাস, রাত্রী ও প্রীতিলতা বিশ্বাস ( প্রীতি খেয়ালী) খুলনা বেতারে শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৮৫ সালে একদিন ইউনুস আলী মোল্লা সাহেবের বাড়ীতে গান শেখার জন্য আসেন আজকের নামকরা শিল্পী মনির খান। তিনি নিজের ছোটভাই হিসেবে গ্রহন করে নেন এবং অনুশীলনের পর অনুশীলন এবং চর্চার পর চর্চা করাতে থাকেন।

চাকুরীর কারণে ১৯৯৫ সালে ইউনুস আলী মোল্লা বাংলাদেশ সচিবালয়ের কৃষি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। পাশাপা‌শি ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করতে থা‌কেন। ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালে খুলনা বেতার কেন্দ্র হতে এবং ১৯৯৮ সালে বাংলাদের টেলিভিশনের গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের ও ভারতের বহু দৈনিক, মাসিক, সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা লিখেছেন। আকাশবাণী কলকাতার প্রাত্যহিকী অনুষ্ঠানে তাঁর বহু লেখা প্রচারিত হয়েছে। কলকাতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গান পরিবেশন করেছেন তি‌নি।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ খবর

spot_img