18 C
Dhaka

‘স্তন’ মন্তব্যে তোলপাড়, ‘বডিশেমিং’ অপবাদের জবাব দিলেন তসলিমা

প্রকাশিত:

বরাবরই সাহসিকতার সঙ্গে নিজের মনের কথা অকপটে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অনেকবারই হোঁচট খেতে হয়েছে বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে। সত্যকথনের জন্যই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তারপরও সত্যকথন থামেনি তসলিমার। নিয়মিত লিখে চলেছেন নিজের মনের গহীনে জমে থাকা কথা আর ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবার ভেতর।

ইদানিং খুব বেশি ফেসবুকনির্ভর হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। মনের ভাব প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী এই মাধ্যমকে। প্রায় নিয়মিতই ফেসবুক পোস্টে নিজের ভিতরে জমে থাকা কথা অকপটে প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

সম্প্রতি এমনই এক ফেসবুক পোস্ট নিয়ে তোলপাড় উঠেছে নেট দুনিয়ায়। তসলিমা তার ওই ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যাদের স্তন দেখতে ভালো নয় তারা কেন খোলামেলা পোশাক পরেন!

তসলিমা নাসরিনের যে ফেসবুক পোস্ট নিয়ে অনলাইনে তুলকালাম :

গত বুধবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে তসলিমা নাসরিন তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, সুগোল, সুডৌল, দৃঢ় স্তন দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। মেয়েরা স্তন দেখানো, স্তনের ভাঁজ দেখানো জামা পরলে বেশ লাগে দেখতে।

সুদর্শন পুরুষরা যেমন শর্টস পরলে বা সুঠাম পেশীবহুল বাহু দেখানো হাতখোলা টিশার্ট, বুকের লোম দেখানো ডিপ ভি-নেক টিশার্ট পরলে দেখতে ভালো লাগে, তেমন মেয়েরা কিছুটা নিতম্ব ঝিলিক দেওয়া সুগঠিত পা দেখানো মিনি শর্টস পরলে, স্তনের ভাঁজ বা অর্ধেক স্তন, পেট এবং নাভি দেখানো ছোট টপস পরলে দেখতে বেশ লাগে।

কিন্তু আজকাল কী যে হয়েছে, যার স্তন দেখতে ভালো নয়, ঝুলে পড়েছে বা প্রায় সমতল তারাও বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জগতের তারকারা ডিপ ভি নেক পোশাক পরেন। কেন যে পরেন, কী দেখাতে বুঝি না।

আর বিশাল বপুর কুচ্ছিত পুরুষগুলোও আঁটসাঁট জামা পরে চললেন। চোখ সরাতে পারলে বাঁচি! সমুদ্রতীরে বা লেকের পাড়ে রোদ্রস্নান করতে থাকা সাঁতার কাটার পোশাক পরা ছেলে আর অন্তর্বাস পরা মেয়ে দেখলে চোখের আরাম হয়। কিছুই না পরা ছেলে- মেয়ে দেখলে তো মনের আরাম হয়। মানুষ যে প্রকৃতির সন্তান, তা তো নগরীর কোলাহলে অনেকটা ভুলতে বসেছি।

তসলিমার এই ফেসবুক পোস্ট নজরে আসার পর থেকেই অনলাইনে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় অনেকেই মন্তব্য করেন, অন্যের শরীরের আকৃতি নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করার কোনও অধিকার তার নেই।

কে কী পোশাক পরবে সেটা তার একান্তই নিজস্ব ব্যাপার সে বিষয়ে নাক গলানোর অধিকার কারো থাকতে পারে না। তসলিমা নাসরিনের মতো একজন সচেতন নারী কিভাবে অন্য নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করে কথা বলতে পারলেন তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন অনেকেই।

তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে বডি শেমিংয়ের অভিযোগ তোলেন নেটিজেনরা।

তসলিমা নাসরিনের জবাব :

নেট দুনিয়ায় তোলপাড় ওঠার পর তসলিমা নাসরিন তার বিরুদ্ধে ওঠা বডি শেমিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আরেকটি ফেসবুক পোস্ট দেন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ৪২ মিনিটে। সেখানে তিনি লেখেন, আমি আবার পলিটিক্যালি কারেক্ট কবে হলাম? চিরকালই আমি পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট।

সে কারণেই আমার শত্রুর শেষ নেই। সে কারণেই ফতোয়া, মিছিল, হুলিয়া জারি। দেশ থেকে বিতাড়ন, বই নিষিদ্ধ। অন্য দেশেও একই পরিস্থিতি। গৃহবন্দীত্ব, রাজ্য থেকে বিতাড়ন। দেশত্যাগে বাধ্য করা। সর্বত্র ব্রাত্য আমি।

আমি বেড়াল ভালোবাসি বললে কিছু লোক ঘেউ ঘেউ করে উঠবেই। বলবে, আমি কুকুর ভালোবাসি না। সুতরাং কুকুরপ্রেমীরা একজোট হয়ে আমার কুৎসা রটাবে।

একবার আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনার বর্ণনা করেছিলাম এভাবে- মেয়েরা দূরপাল্লার বাসে বসে ছিল। বাস মাঝপথে থামার পর পুরুষরা বাইরে গিয়ে প্রস্রাব করে এলো। মেয়েরা প্রস্রাব আটকে বাসেই বসে রইলো। অমনি লোকেরা বলতে শুরু করলো, আমি নাকি বলেছি, মেয়েরা ছেলেদের মতো দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করুক।

একবার লিখলাম, মুসলমান পুরুষরা চার বিয়ে করতে পারে। ইসলাম ধর্ম পুরুষকে একসঙ্গে চার স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে। অমনি লোকে বলতে শুরু করলো, আমি নাকি মেয়েদের চার বিয়ের অধিকার চাইছি। অর্থাৎ মেয়েরা যেন চার স্বামী নিয়ে একসঙ্গে এক ঘরে বাস করতে পারে। আমি যতটুকু ভাবি, তার চেয়ে বেশি ভেবে নেয় কিছু পাঠক। কারণ তাদের উদ্দেশ্য- ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক আমার বদনাম করা।

মেয়েদের শরীরের কোন অংশ এবং পুরুষের শরীরের কোন অংশ দেখতে ব্যক্তি আমি পছন্দ করি তা জানানোর পর কিছু লোক ঘেউ ঘেউ করে উঠেছে। কী পোশাক কাকে মানায়, কাকে মানায় না তা বলাতেও ঘেউ ঘেউ। এর মানে আমি নাকি মেয়ে বা পুরুষ কোন পোশাক পরলে আমার চোখে মানায় না বলেছি। তাদের বডিশেমিং করছি।

আমরা তো দিন-রাতই বলছি, এ পোশাক ওকে মানাবে, সে পোশাক তাকে মানাবে। মোটাদের জন্য এক ধরনের পোশাক, পাতলাদের জন্য আরেক (ধরনের পোশাক)। লম্বাদের জন্য এক রকম, বেঁটেদের জন্য আরেক (রকম)। তরুণীদের জন্য এক রকম, বৃদ্ধাদের জন্য আরেক (রকম)।

আওয়ারগ্লাস বডি (আদর্শ মাপের শরীর : ৩৬-২৪-৩৬) হলে এক রকম, না হলে আরেক রকম। এসব বিভিন্ন পোশাক কোম্পানিই তৈরি করে। ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলো বলে দেয় কার কী পরা উচিত।

আমার ব্যক্তিগত মত, স্তন ঝুলে পড়লে পুশআপ (পুশআপ ব্রা পরা) ভালো, বুকখোলা অন্তর্বাসহীন পোশাক না পরাই ভালো। আর ঝুলে না পড়লে খোলা রেখে চললেও ঠিক আছে।

এ বডিশেমিং নয়, বরং বডিশেমিং থেকে মেয়েদের বাঁচানো। এর নাম সত্যকথন। চরম তসলিমা বিদ্বেষীরাও তা জানে। জানে, কিন্তু মুখে উল্টোটা বলবে। এরা ঘেউ ঘেউ করবেই।

বেঁটেকে বেঁটে কেন বললাম, লম্বাকে লম্বা কেন বললাম, মোটাকে মোটা কেন বললাম, পাতলাকে পাতলা কেন বললাম! সুন্দরকে সুন্দর কেন বললাম? তাহলে অসুন্দরদের তো বডিশেমিং করে ফেললাম। সুদর্শনকে সুদর্শন কেন বললাম, তাহলে তো কুদর্শনের বডিশেমিং করে ফেললাম।

মোদ্দা কথা, সর্বনাশ করে ফেললাম! আমি কাউকে বলিনি তুমি দেখতে বেঁটে। তুমি লম্বা আলখাল্লা পরো না। আমি বলিনি, তোমার ঝুলন্ত স্তন, তুমি ভুলেও স্তন দেখানো পোশাক পরো না।

যার যে পোশাক পরার ইচ্ছে সে পোশাকই পরবে। আমার কোনটা ভালো লাগছে, কোনটা ভালো লাগছে না তা আমি বলবো। এতে এত ঘেউ ঘেউ এর কী আছে?

দাঁড়ান, যদি বলিই তোমাকে এই পোশাকে মানাচ্ছে না, যদি উপদেশই দিই এটা পরো না ওটা পরো, তাতে এত বিচলিত হওয়ার কারণ কী? আমি তো দিন-রাত মেয়েদের উপদেশ দিচ্ছি। হিজাব-বোরখা পরো না। ওসব পোশাক নারী নির্যাতনের প্রতীক। ওসব পোশাক পরলে নিরেট যৌনবস্তু ছাড়া তোমার আর কোনো পরিচয় থাকে না।

আমার উপদেশ কজন মেয়েই বা শুনছে! কিন্তু আমি তো সারা জীবনই এই উপদেশ দিয়ে যাবো। আমার এই মত আমি প্রকাশ করবোই। যতই আমাকে ‘চয়েজ’বাদীরা গালি দিক।

নারীর অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অনেকে মনে করে নারীর ‘লজ্জাস্থান’। লজ্জাস্থান নিয়ে কথা বলাটাই তাদের কাছে স্পর্ধা বলে মনে হয়েছে। সুতরাং আমার স্পর্ধা তারা মানবে কেন?

তা না মানুক, আমার তো স্পর্ধা দেখাতে জুড়ি নেই। সত্যকথন বা ভিন্নমত কোনোকালেই সমাজের অধিকাংশ কূপমণ্ডুক সহ্য করতে পারেনি। আজ হঠাৎ কী ঘটে গেল যে সহ্য করবে? আমি আশাও করি না। বিরুদ্ধ স্রোতে আমি জীবনভর চলেছি। অতীতে চলেছি, আজও চলছি, যতদিন বাঁচি চলবো। এ নিয়ে আমার কোনো দুঃখ নেই।

লেখক : তসলিমা নাসরিন, সাহিত্যিক।

সম্পর্কিত সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

spot_img